সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের একমাত্র নারী ইজি বাইক চালক যাত্রী রাণী দত্ত। জেলা শহরের এমন কেউ নেই তাকে চেনেন না। শত প্রতিকূলতার মাঝেও করোনা পরিস্থিতিতে ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে লড়াই করছেন টিকে থাকার। কিন্তু সে লড়াইয়ে ধীরে ধীরে হেরে যাচ্ছেন যাত্রী। তার স্বামী হৃদয় চন্দ্র দত্তের কিডনিতে ইনফেকশন। দারদেনা করে এতোদিন চিকিৎসা করিয়েছেন। এখন আর তার চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা নেই।
যাত্রী রাণী দত্ত জানান, আমি খুব কষ্টে আছি। আমার স্বামী এখন মৃত্যুশয্যায়। চিকিৎসা না করালে বাঁচাতে পারবো না। যদি কেউ আমারে দয়া করে সাহায্য করেন তাহলে আমার স্বামীকে বাঁচাতে পারবো।
যাত্রীর বাবা যখন মারা যান, তখনো তাঁর শিশু বয়স। সেই বয়সেই নিজে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। দুই বোনকে বিয়েও দেন। এরপর নিজেও বিয়ে করে চেয়েছিলেন সুখের সংসার করতে। কিন্তু তা হয়নি। এবার তার সুখের সংসারে আঁধার নেমে এসেছে। কারণ তার স্বামী হৃদয় চন্দ্র দত্তের শরীরে বাসা বেঁধেছে রোগ। সে রোগ সারাতে অনেক টাকা প্রয়োজন। কিন্তু সে সাধ্য নেই যাত্রীর। স্বামীকে হাসপাতালে রেখে ঔষুধের টাকা জোগাড় করতে লকডাউনের মাঝেও ইজিবাইকের স্ট্রিয়ারিং ধরেছেন। রাস্তায় পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছেন। কান্নাকাটি করে সেখান থেকে ইজিবাইক নিয়ে আসতে পেরেছেন।
জানা যায়, প্রায় ৭ মাস যাবৎ তার স্বামী অসুস্থ। প্রথম দিকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল নিয়ে আসলে ডাক্তার সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য বলেন। ইজিবাইক চালিয়ে যে ২টি ইজিবাইক নিজে কিনেছিলেন তার একটি বিক্রি করে চিকিৎসা করিয়েছেন তখন। তখন সাময়িক ভালো হলে বাড়ি ফিরে আসেন স্বামীকে নিয়ে। কয়েকদিন পর আবারও পেট ব্যাথা শুরু হয়। তখন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করান। এখন আবারও যাত্রী’র স্বামীর অসুখ বেড়েছে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন স্বামী হৃদয় চন্দ্র দত্ত। ডাক্তার বলেছে যত দ্রুত সম্ভব সিলেট নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু স্বামীকে এখন সিলেট নিয়ে যাবার গাড়ী ভাড়াই নেই তার কাছে।
জানা যায়, যাত্রী রাণী দত্ত তাহিরপুর উপজেলার টেকাটুকিয়া গ্রামের মৃত. দেবেন্দ্র বর্মণ ও শুভা রাণী বর্মণের বড় মেয়ে। যাত্রীর বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর বাবা মারা যান। সেই থেকে তাঁর সংগ্রাম শুরু হয়। পাথর ভাঙা, অন্যের বাসায় কাজ, মেসে রান্না করা সহ সব কাজই করেছেন যাত্রী। এখন শহরের নবীনগরে স্বামী, মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকছেন।
জীবনসংগ্রামে হার না মানা যাত্রীকে গেল ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননা দেয়া হয়। যাত্রীর স্বামীর বাড়ি জামালগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামে। হৃদয় দত্ত বাড়ি থেকে অভিমান করে সুনামগঞ্জ পৌর শহরে এসে রিকশা চালাতেন। ৯ বছর আগে হৃদয় দত্তকে বিয়ে করেন যাত্রী। কিন্তু তিনি বর্মণ বংশের হওয়ায় শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি। এখন শহরতলীর নবীনগরে ২ রুমের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন।
যাত্রীর স্বামী হৃদয় চন্দ্র দত্ত ৭ মাস যাবত বিছানায়। রিকশা নিয়ে বের হতে পারেন না। এই ৭ মাসে বাসা ভাড়া সহ ৬ সদস্যের পরিবারের খরচ একাই চালিয়েছেন যাত্রী। যাত্রী বলেন, আমার ৩ ছেলে মেয়ে। সঙ্গে স্বামী হৃদয় চন্দ্র দত্ত ও মা শুভা রাণী বর্মণ থাকেন। আমার স্বামীর অবস্থা খুবই খারাপ। ডাক্তার বলেছে সিলেট নিয়ে যেতে। সবচেয়ে ভালো হয় ঢাকা নিয়ে গেলে। এখন সিলেট নিয়ে যাওয়ারই ক্ষমতা নেই আমার। গতবারও একবার সিলেট নিয়ে গেছি। তখন ১০ দিন ভর্তি ছিলাম। পরে বাড়িতে আসার পর ১০- ১৫ দিনের মতো ভালো গেছে। পরে দেখা গেছে আবার একই ব্যথা, জ¦র, বমি। পরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করাই। এই নিয়ে ৪ বার ভর্তি করাইছি। এখন আমার স্বামীকে সিলেট নিয়ে যে যাবো সে টাকা নেই। একটা গাড়ি আগে বিক্রি করে চিকিৎসা করাইছি। এখন আরেকটা আছে সেটাও বিক্রি করার চেষ্টা করছি। বিক্রি করতে পারলে সিলেট নিয়ে চিকিৎসা করাবো।
যাত্রী’র স্বামী হৃদয় চন্দ্র দত্ত বললেন, আমার পেটের ডান দিকে ব্যথা। সে ব্যথার কারণে কোমরে ও বুকে ব্যথা করে। অসুখ হওয়ার পর থেকে অটো নিয়ে বের হতে পারছি না। আমি আমার পরিবারের জন্য বাঁচতে চাই।
যাত্রী’র মেয়ে ৬ বছরের ঝুমা দত্ত হাসপাতালে অসুস্থ বাবার পাশে বসে কান্নাকাটি করছে। সে বললো, বাবা অসুস্থ। আমার বাবা সুস্থ হোক আমরা চাই। আমার বাবা সুস্থ না হলে আমরাও মারা যাবো। আমার বাবাকে সুস্থ করে দিন।
মেডিকেল অফিসার ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বললেন, উনার কিডনিতে ইনফেকশন হয়েছে। আমাদের হাসপাতালে তিনি আগেও ভর্তি ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইউরোলজি বিভাগে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে তারা চিকিৎসা দিয়ে ছাড়েন। এখন আবার তিনি অসুস্থতায় ভুগতেছেন। প্রশ্রাবের সমস্যা ও পেটে ব্যথা নিয়ে ভর্তি আছেন। ইউরোলজি ডিপার্টমেন্ট আমাদের সদস হাসপাতালে না থাকায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে নিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, যেহেতু আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল তাই কিছু আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। কারণ সিলেটে যাতায়াত করা, থাকা, সব মিলিয়ে কিছু টাকার প্রয়োজন। দ্রুত চিকিৎসা করাতে পারলে তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। নয়ত দীর্ঘ মেয়াদী এই ইনফেকশন থাকলে কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


