বয়স বাড়িয়ে বাল্য বিয়ের চেষ্টা

সাইদুর রহমান আসাদ
২০১৮ সনের সমাপনী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের কথা নাহিদা আক্তারের। কিন্তু বাবার দারিদ্রতার কারণে পরীক্ষা দেয়া আর হয়ে ওঠেনি তার। তাই মেয়েকে বিয়ের আসরে বসাতে চান বাবা। কিন্তু বয়সের মারপেঁছে তা এতোদিন আর হয়ে ওঠেনি। তবে স্থানীয় কাউন্সিলরের সহযোগিতায় নতুন জন্ম নিবন্ধন করে বয়স বাড়িয়ে বুধবার (২৬ মে, ২০২১) বিয়ের আয়োজন করেন বাবা। এ খবর পেয়ে সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় বিয়ে বন্ধ করেন।
ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জলিলপুর গ্রামে। দরিদ্র বাবার নাম জসিম মিয়া। তার ২ মেয়ে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন প্রায় ৫ বছর আগে। ছোট মেয়ে নাহিদা আক্তারের বিয়ে ঠিক করেন একই ওয়ার্ডের ওয়াজখালী গ্রামে আসমান মিয়ার সঙ্গে। গত ১ মাস যাবৎ পরিকল্পনা করে আত্মীয় স্বজনদের উপস্থিতিতে বিয়ের তারিখও ঠিক করেন। সে অনুযায়ী বয়স বাড়িয়ে মহিলা কাউন্সিলরের সহযোগিতায় একটি জন্ম নিবন্ধন করিয়ে নেন জসিম মিয়া। বুধবার দুপুরে কনের বাড়িতে বরযাত্রী যাওয়ার কথা। তবে এর আগেই সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হন সেখানে।
সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি দাবি করলে পরিবার বলেন বয়স হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে দেখান জন্ম নিবন্ধন সনদ। সনদ প্রদানের তারিখ বলছে গত মাসের ১২ তারিখ করা এ জন্ম নিবন্ধনটি। সেখানে নাহিদা আক্তারের জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২০০০ সনের ১৫ জুলাই। সে অনুযায়ী তার বয়স দাঁড়ায় ২০ বছর ১০ মাস ১১ দিন (২৬ মে, ২০২০ পর্যন্ত)। তবে নাহিদাকে দেখে মনে হয়নি তার ২০ বছর হয়েছে।
নাহিদা আক্তার সর্বশেষ শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো। তার বিদ্যালয় থেকে জানা যায়, সে ২০১৮ সালের সমাপনী পরীক্ষার্থী ছিলো। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ২০১৮ এ অংশগ্রহণকারী ছাত্র ছাত্রীদের বিবরণ তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়। যার রোল নম্বর ৫৬০৭। সেখানে তার জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২০০৪ সালের ১৫ জুলাই। খোঁজ পাওয়া যায় বিদ্যালয়ে জমা দেয়া পুরানো আরেকটি জন্ম নিবন্ধনের। সে জন্ম নিবন্ধনে নাহিদার ব্যক্তিগত পরিচয় নম্বর দেয়া আছে ২০০৪৯০২৮৯০৯০০৬৪৬৭। এ নিবন্ধনে জন্ম তারিখ রয়েছে স্কুলের দেয়া জন্ম তারিখ ২০০৪ সনের ১৫ জুলাই। এ পুরোনো নিবন্ধন অনুযায়ী নাহিদার বয়স দাঁড়ায় ষোলো বছর দশ মাস এগারো দিন। এ জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে ২০১১ সনের জানুয়ারি মাসের ৪ তারিখ।
জন্ম নিবন্ধন দেয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, কারো জন্ম নিবন্ধন করার প্রক্রিয়াটি খুবই স্বচ্ছ। অনেক যাচাই বাচাই করে জন্ম নিবন্ধন দেয়া হয়। এজন্য স্থানীয় কাউন্সিলের সুপারিশ প্রয়োজন হয়। পরে কাউন্সিলরের সুপারিশের ভিত্তিতে পৌর মেয়র তথ্যগুলো যাচাই বাচাই করে তাঁর আইডি থেকে অনলাইনে নিবন্ধন ফরম পূরণ করেন।
এবিষয়ে জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরি ভট্টাচার্য্য বললেন, বাল্যবিয়ে রোধে স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে আরও সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। একটা প্রতিষ্ঠান থেকে দুইটা জন্ম নিবন্ধন হয় কিভাবে? জন্ম নিবন্ধন বাল্যবিয়ে বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এব্যাপারে স্থানীয় সরকারকে আরও সচেতন হতে হবে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে ৭, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর জাহানারা বেগম বললেন, আমি ৪ বার একই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। আমি সবাইকে চিনি। প্রথমবারের নির্বাচনের সময় এ মেয়ে ছোট ছিলো। এরপর আরও ষোলো বছর গেছে। এ অনুযায়ী তার বয়স প্রায় ২০ বছর দেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের জন্মতারিখে বয়স কমিয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এমদাদ আলী বললেন, বাল্যবিয়ে বন্ধে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। এবিষয়ে আমরা কাজ করছি।
এদিকে বাল্যবিয়ের ঘটনাটি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনকে জানালে উপজেলা সহকারী ভূমি কমিশনার মো. আরিফ আদনান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি কাগজপত্র যাচাই করে বিয়ে বন্ধ করার নির্দেশ দেন। পরে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. গোলাম আহমদ ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিলর জাহানারা বেগমের উপস্থিতিতে কিশোরির আঠারো বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দিবেন না মর্মে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর দেন পিতা মো. জসিম উদ্দিন।
এবিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমরান শাহরীয়ার বললেন, বিষয়টি আমরা জানি। তাই মেয়েটির মেডিকেল পরীক্ষা করানোর জন্য বলা হয়েছে। ডিসি স্যারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেছেন মেডিকেল পরীক্ষায় বয়স বাড়ানোর সত্যতা পাওয়া গেলে কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত বললেন, ঘটনাটি আমি জানি না। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, দুটি জন্ম নিবন্ধন করা বেআইনি। যারা করেছে তারা অপরাধ করেছে। আমরা আজকে বিয়ে বন্ধ রেখেছি। মেডিকেল পরীক্ষার ফলাফলে যদি কিশোরির আঠারো বছর হয় তাহলে বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারবেন পরিবার। তবে মেডিকেল সার্টিফিকেটে যদি মেয়ের বয়স আঠারো বছর না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।