করোনার ভয়ঙ্করেও স্বাস্ব্য খাত অসুস্থ

মো. আবু তাহের মিয়া
বৈশ্বিক মাহামারী কোভিড ১৯ দেখিয়ে দিলো আমরা কোন সমাজে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বসবাস করছি। একদিকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই অন্যদিকে জীবন ও জীবিকার একসঙ্গে লড়াইয়ে বিপর্যস্ত হয়েছে জনসাধারণ। বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যবস্থায় নেমে এসেছে সীমাহীন দূর্ভোগ ও নাজুক অব্যবস্থাপনা । বহুদিনের স্বাস্থ্য খাতে বেহালদশা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও কেলেঙ্কারি অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠে। করোনা ভাইরাস চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলছে জনসাধারণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। তারপরও দেশজুড়ে যে হাজার হাজার প্রাইভেট বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ৬৫৪ টি সরকারি হাসপাতাল এবং ৫০৫৫ টি বেসরকারি হাসপাতাল আছে। পরিসংখ্যান বলে দেয় বেসরকারী হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবার মান যে কেমন তা যারা ভূক্তভোগী তারাই জানেন। সরকারী হাসপাতালগুলোর মান ও ব্যবস্থায় নিম্নমুখী আর বেসরকারি হাসপাতালে আধিপত্য বেড়েই চলছে। বেসরকারি হাসপাতাগুলোর উপর নির্ভর হওয়ার খেসারত দিতে হলো বাংলাদেশের জনগণকে।
বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ১৯৯০ থেকে বিভিন্ন খাতে বেসরকারি করণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য খাতকে বেসরকারি করণ শুরু হয় বাংলাদেশেও। ২০০১ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায়, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন বিএনপি নেতা খন্দকার মোশারফ হোসেন। তাঁর ছিলো, চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে থেকে অর্থ যেন বিদেশে চলে না যায়। সেজন্য বেসরকারি হাসপাতালকে উঠতে সহায়তা করা হয়েছিল।
সংবিধানে চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার বলা হয়েছে। কিন্তুু সংবিধানে মৌলিক উপকরণ হিসেবে পড়ে আছে। বাস্তবে আমারা কী দেখি, যাদের টাকা আছে তারাই চিকিৎসা পাবার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। গরীবের টাকা নাই চিকিৎসা নাই। হাসপাতাল থাকলেও ডাক্তার নেই, ডাক্তার থাকেলও ওষুধ নেই। ওষুধ থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা না পেয়ে বিকল্প চিকিৎসার পথ বেঁচে নেন অনকেই। যেমন চিকিৎসার বিকল্প হিসেব বেঁচে নেন, তার মধ্যে আছে ঝাড়ফুঁকে চিকিৎসা ,পানিপড়া, তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ-কবজেই শেষ ভরসা
আমাদের দেশে অতি- দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় মারা যায়। অন্যদিকে ‘অতি- ধনিক শ্রেণিরা মানুষ সরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা করান না। সর্দি কাশি হলেই প্রাইভেট নয় বিদেশে চিকিৎসা নেন। বেসরকারি ক্লিনিক- হাসপাতাল উপর নির্ভরশীলতা যে ভালো নয় সেটি প্রমাণ হয়েছে এবার কোভিড-১৯ মহামারিতে । কিন্তু কোভিড১ ৯ মহামারির এই সময়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তখন আবার একমাত্র ভরসার জায়গা হয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলো।
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হাবার পর থেকে আমরা দেখি। কোভিড ১৯ -এ আক্রান্ত হয়ে ব্যবসায়ী, উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা কিংবা এমপি- মন্ত্রীরা, রাজনীতিবিদরা অনেকেই বাধ্য হয়েছেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে এদের অনেকে বাংলাদেশে চিকিৎসা করানোর বিষয়টি চিন্তা করতে পারতেন না। দুর্যোগের এই সময়টিতে সরকারি হাসপাতাল হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। সাধারণ জনগণের সাথে তারা চিকিৎসা নিয়েছেন।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নির্ভর হওয়ার খেসারত দিতে হয়েছে করোনাকালীন সময়ে। করোনা সংক্রমণের ভুয়া রিপোর্ট দেয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ও সাবরিনা চৌধুরীকে ঘটনা সবার জানা। কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খরচ অস্বাভাবিক রকমের বেশি।
এই মহামারি করোনা মোকাবিলায় ঘুরে দাঁড়ানোর দরকার। স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও আধুনিক ও উন্নত পর্যায়ে নেওয়া যায়। এ লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী সঠিকভাবে সঠিক জায়গায় নিয়োগ করতে হবে। সাধারণ মানুষের উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য তথ্যের ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। এর বাইরে টিকা ও স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম পরিচালনা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর বিষয়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
মহামারি করোনাভাইরাস আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক কী কী দুর্বলতাকে তুলে ধরেছে। এ দেশের সাধারণ মানুষ বিনা চিকিৎসা অবহেলা যেন মারা না যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। নুন্যতম চিকিৎসাটুকু যেন সরকারি হাসপাতালগুলো পাওয়ার অধিকার থাকে। করোনা আর কতটুকু ভয়ঙ্কর হলে স্বাস্থ্য খাতে দূর্নীতি, অনিয়ম, বেসরকারিকরণ দূর হবে?
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সুনামগঞ্জ জেলা সংসদ