বাদ্য বাজে না তাই খাবার জুটে না

পুলক রাজ
নিউ ব্যান্ডপার্টিতে প্রায় ৬০-৭০ জন বাদক রয়েছে, বছরভর বহু অনুষ্ঠান করি, গত বছর করোনা ভাইরাসের জন্য আমার ব্যান্ড পার্টি বন্ধ ছিলো দীর্ঘদিন, বছরের শুরু থেকে ব্যান্ড পার্টির কাজ শুরু হয়েছিলো, কিন্তু আবারও করোনা পরিস্থিতির কারণে বিধি নিষেধ দেয়ায় অত্যন্ত সঙ্কটে পড়েছি আমরা, কোন কূল কিনারা পাচ্ছি না. সংসার কি ভাবে চালাবো, বউ, ছেলে-মেয়েদের মুখে কিভাবে খাবার দিবো? চারিদিকে অন্ধকার দেখছি। বলছিলেন নিউ ব্যান্ডপার্টির আক্রম আলী।
শুধু আক্রম আলী নন এই পেশার সাথে যুক্ত সবাই চরম সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন। বিয়ে ছাড়াও জম্মদিন, মিছিল, পহেলা বৈশাখ, রাজনৈতিক মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ, র‌্যালি, নির্বাচনের বিজয় অনুষ্ঠানসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে ব্যান্ড পার্টির উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেকের জীবন-জীবিকা। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে কোনখানেই আড়ম্বর করে বিয়ে হচ্ছে না। বাদ্য বাজনাদারদেরও ডাক পড়ছে না। কাজ হারিয়ে অনেকে পরিবার নিয়ে একেবারে অথৈ জলে পড়েছেন। দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করাই কষ্ট হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাঁদের কাছে। দুর্দশায় পড়ে অনেকে আবার বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন।
আক্রম আলী বলেন, ছোট বেলা থেকে ব্যান্ডপার্টির সাথে যুক্ত রয়েছি। আমার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়, থাকি মুক্তারপাড়ায়। অন্য কাজ তেমন জানি না। শেষে অনেক ভাবনা চিন্তা করে একটা ঠেলা গাড়ি কিনেছি। এখন ঠেলা গাড়ি নিয়ে কলা বিক্রি করি। আমার মতো অনেক ব্যান্ড বাদকরা সংসার চালাতে নিজের পেশা ছেড়ে জীবনের তাগিদে অন্য পেশাকে জীবিকা হিসেবে বেঁচে নিতে হয়েছে। পরিস্তিতি যদি স্বাভাবিক হয়, আর প্রশাসন যদি অনুমতি দেয় তাহলে আবার বিয়ে মিছিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যান্ড বাজাতে পারবো।
পৌর শহরের মুক্তার পাড়া এলাকার শিল্পী ব্যান্ড পার্টির বাদক জনি দাশ বলেন, অন্য সব ব্যবসা চললেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যান্ড পার্টির ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। অথচ আমরা যুগযুগ ধরে, বিয়ে, গায়েহলুদ, পহেলা বৈশাখ, জন্মদিন, মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ র‌্যালি সহ যে কোনো অনুষ্ঠানে মানুষের মনে আনন্দ দিয়েছি। আমাদের ব্যান্ডপার্টির যদি কাজকর্ম না থাকে, তাহলে আমরা যারা শিল্পীরা ব্যান্ড পার্টির সাথে নিযুক্ত আছি কি ভাবে চলবো।
তিনি বলেন, গত রবিবারে একটা বিয়ে ছিলো আমাদের বিয়ে বাড়িতে নিয়েছিলো। কিন্তু প্রশাসনের লোক এসে আমাদেরকে বাধা দিয়ে যায়। তখন তো আর কিছু করার ছিলো না। খুব কষ্ট পেয়েছি তখন। মনে হচ্ছে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।
বাদক পরেশ চন্দ দাশ বলেন, আগে বিয়ের তারিখ যে মাসে বেশি, বিশেষ করে আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ^ীন, ফাল্গুন মাসে ব্যান্ডপার্টিকে ব্যস্ত সময় কাটাতে হতো, কিন্তু এখন একদম কাজ হচ্ছে না। যদি কাজ না হয়, তাহলে কিভাবে সংসার চালাবো।
তিনি বলেন, দোকান ভাড়াও দিতে হিমশিম খাচ্ছি। বংশের ধারবাহিকতায় যুগের পর যুগ ধরে যে পেশাকে আমরা লালন করে এসেছি। আমাদের পক্ষে এই দুর্বিসহ সময়েও সে শিল্পের মায়া কাটিয়ে অন্য পেশাকে গ্রহণ করা কষ্টকর।