এমন ঘরে থাকার স্বপ্ন দেখিনি

সোহেল তালুকদার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ
সারাদিন কাজ শেষে এখন আর ফুটপাত বা অন্যের ঘরে থাকতে হবে না। ভূমিহীন ও গৃহহীন হতদরিদ্র আয়বানু বিবি ও আমিরুন নেছা এখন প্রতিদিন থাকতে পারবেন নিজ ঘরে। শুধু ঘরই নয়, থাকছে নিজ নামে দুই শতক জমি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, সুন্দর বারান্দাসহ বসবাসের নিরাপদ সুবিধা। আগামী রবিবার আয়বানু বিবি ও আমিরুন নেছা’র মত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলো পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া স্বপ্নের বাড়ি। ঐদিন সকালে গণভবন থেকে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারদের মধ্যে এসব বাড়ি হস্তাস্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় ১ম পর্যায়ে ৩ হাজার ৯০৮টি ও ২য় পর্যায়ে ৩৫৮টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পাচ্ছে ‘স্বপ্নের নীড়’। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় ২য় পর্যায়ে ৩৫৮টির মধ্যে ২০৯টি ঘর হস্তান্তর করা হবে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকার ভূমিহীন মৃত. আব্দুল আহাদের স্ত্রী আয়বানু বিবি ও শামছুন নুরের স্ত্রী আমিরুন নেছা বলেন, আমি ছেলে, মেয়ে-নাতি-নাতনি নিয়ে মানুষের জায়গায় কুঁড়েঘর তুলে থাকি। স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি যে, আমি জমিসহ ইটের একখানা নতুন ঘর পাবো। শেখ হাসিনার সরকার আমাকে ইটের ঘর দিবেন। এই বয়সে ইটের পাকা দালান ঘরে থাকতে পারবো। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি ঘর পেয়ে। দোয়া করি শেখ মুজিবের বেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য।
মৎস্যজীবী শামছুন নুরের স্ত্রী আমিরুন নেছা জানান, ছোট ছোট ৭টি সন্তান নিয়ে খড়কুটার ঘড়ে থাকতাম, বৃষ্টি এলেই অন্যের বাড়িতে ও বারান্দায় আশ্রয় নিতাম। সরকার আজ আমরারের একটি সুন্দর ঘর দেওয়ায় আমরা এখন অনেক খুশি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো শাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়া জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি ঘরের জন্য দুই শতাংশ খাসজমির বন্দোবস্তসহ দুই কক্ষের সেমিপাকা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘরের প্রতিটিতে একটি রান্না ঘর, টয়লেট ও সামনে খোলা বারান্দা রয়েছে। প্রতিটি ঘরে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা করে ব্যয় ধরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি জানান, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জন্য সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মাধ্যমে ‘ক’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত ভূমিহীন ও গৃহহীন ৪১১টি পরিবারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রথম ও ২য় পর্যায়ে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২৬১টি পরিবারকে জমি ও ঘর নির্মাণ করে দিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জয়কলস ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে ৬২, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের ঘোড়াডুম্ভুর ও পিটাপসী গ্রামে ১৫১টি এবং পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে নবীনগর ও শত্রুমর্দন গ্রামে ৫১টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা করে। তবে প্রথম পর্যায়ে নির্মিত ১০টি ঘরে সরকারি বরাদ্দ ছিলো ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে।
উপজেলার জয়কলস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাসুদ মিয়া জানান, মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভূমিহীন-গৃহহীনদের জন্য নির্মিত ঘর গুলোর উপকার ভোগী বাচাই করা হয়েছে। প্রকৃত ভূমিহীনদের বাছাই করে এই ঘরগুলো নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। এই জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এই অঞ্চলের মানুষের পক্ষ থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার উজ জামান বলেন, ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মানসম্মত ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। সুবিধাভোগীরা অধিকাংশই রাস্তার ধারে ফুটপাত বা কারও আশ্রয়ে বসবাস করতেন। তারা এখন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘর উপহার পাবেন। পর্যায়ক্রমে উপজেলার শতভাগ দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাদের জমি ও ঘর নাই, তাদের বসবাসের জন্য বাড়ি করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ২য় পর্যায়ে ২০৯টি ঘর পাচ্ছেন ভূমিহীন ও গৃহহীনরা। এর আগেও এই জেলায় ১ম পর্যায়ে বিভিন্ন উপজেলায় ৩ হাজার ৯০৮টি ঘর বরাদ্দ হয়েছিলো। সেগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি বলেন, এই প্রকল্পটি আমাদের জন্য একটি গৌরবের ও আত্মমর্যাদার প্রকল্প। বাংলাদেশের কোন মানুষ আর গৃহহীন-ভূমিহীন থাকবে না। আমাদের নেত্রী এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন, আমরা সর্বাত্মক নেত্রীর সাথে আছি। দেশের এই দরিদ্র মানুষ গুলো ঘর পেয়ে কি-যে আনন্দ প্রকাশ করছে তা কেউ না দেখলে বুঝবেন না। একটি আশ্রয়ের আশায় মানুষের দ্বারে দ্বারা ঘুরে যখন মাথা গোজার ঠাঁই পায়নি, ঠিক সেই সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেশের ভূমিহীন-গৃহহীনদের মধ্যে একেবারে বিনামূল্যে ঘর নির্মাণ করে দিবেন। আজ এই প্রকল্পটি সারা দেশে বাস্তবায়ন হচ্ছে। দেশের দরিদ্র মানুষগুলো আজ নিজের একটি ঠিকানা পাচ্ছে, এটা দেশের নাগরিক হিসাবে আমিও খুব গৌরবান্নীত মনে করছি।