বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ্ আব্দুল মালিক কোরেশী

শাহ্ আব্দুল শাহিন কুরেশী
শাহ্ আব্দুল মালিক কোরেশী ১৯৪৪ সালের ৯ আগস্ট (বাংলা ১৩৫১ সনের ২৪ শ্রাবণ) তারিখে জগন্নাথপুর থানার পাটলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শাহ্ মুহাম্মদ সুরুজ মিয়া কোরেশী। তিনি হযরত শাহ্জালাল (রহ.) এর শিষ্য ও অনুসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম খাজা বুরহান কাওনান ছিদ্দিক (রহ.) ও তদপুত্র হযরত শাহ্ কামাল (রহ.)- এর বংশধর। ছোট বেলো থেকেই তিনি খুব জেদী, সাহসী ও কর্মঠ ছিলেন।
গ্রামের পাঠশালাতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী শেষ করে ১৯৫৩ সালে সুনামগঞ্জে Class III (Three) তে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৫৫ সালে Class V (Five) এ উঠে গ্রামের বাড়ীতে চলে যান এবং প্রাইভেট টিউটর দ্বারা বাড়ীতে লেখাপড়া করেন। পরের বৎসর জগন্নাথপুর হাই স্কুলে আবার Class V (Five) এ ভর্তি হন এবং ঐ স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন।
১৯৬৩ সালে মেট্রিক পাশ করে সিলেট এম.সি কলেজে আই.এ- তে ভর্তি হন। ঐ বৎসরই তিনি ইস্ট পাকিস্তান আন্তঃ কলেজ স্কাউটে অংশগ্রহন করনে। ১৯৬৪ সালে সিলেট এম.সি কলেজ থেকে সুনামগঞ্জ চলে আসেন। ১৯৬৪ সালে আয়ূব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৬ সালে তিনি আবার সিলেট এম.সি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকে District Controller এর গাড়ী ভাঙ্গচুর করার কারণে তিনি সহ কয়েক ছাত্রকে ৩০০/- টাকা ফাইন সহ বাহির করে দেওয়া হয়। তিনি বাধ্য হয়ে আবার সুনামগঞ্জ কলেজে চলে আসেন। সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৬৭-৬৮ সালে সুনামগঞ্জ শাখার ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন।
১৯৬৯ সালে বি.এ পাশ করার পর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে General History তে M.A ও ঢাকা সেন্টাল কলেজে L.L.B- তে ভর্তি হন। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে M.A ও L.L.B অধ্যয়নরত অবস্থায় ইকবাল হলে থাকাকালীন সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিজয়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্টী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং বাঙালিদের হাতে শাসনভার ক্ষমতা ছেড়ে না দেয়ার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। ৭ই মার্চের পরে তিনি ঢাকা থেকে বাড়ীতে চলে আসেন।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে তিনি ন্যাপ নেতা গুলজার আহমদ, রনক চৌধুরী, তারা মিয়া, সৈয়দ আব্দুল হান্নান, ছাত্রনেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর মামাত ভাই লুৎফুর রহমান চৌধুরী সহ সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ইন্ডিয়া চলে যান।
ইন্ডিয়া যাওয়ার পর প্রথম দিকে তিনি লাউবা (লাগে) Freedom Fighter Training Center Gi Physical Instructor ছিলেন। পরে Freedom Fighter (Fighter) Commandoes Training করে ছাতক, বিশ্বনাথ, সিলেট সদর পশ্চিম ও জগন্নাথপুরের বিভিন্ন যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন।
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরপরই ফশফন অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ীতে চলে আসেন। ১৯৭২ সালের জানুয়ারীর প্রথম দিকে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেব জগন্নাথপুরের প্রথম জনসভা করার পূর্বের দিন বিকালে জনাব আব্দুর রইছ এম.পি সাহেবের এক খবর পেয়ে জগন্নাথপুর চলে যান এবং আওয়ামীলীগে যোগদান করেন এবং জগন্নাথপুর থানা আওয়ামীলীগের General Secretary হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরে তিনি ঢাকায় চলে যান এবং L.L.B Course সমাপ্ত করে ঢাকাতেই ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসাতে তেমন সুবিধা করতে পারেন নাই। অবশেষে বার কাউন্সিল Advocacy Course করে ১৯৭৪ সালে Advocate হিসাবে সুনামগঞ্জ বারে যোগদান করে ওকালতি পেশায় মনোনিয়োগ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সাধারণ ও মেহনতী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দেশের সকল সাম্যবাদী, রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করে বাকশাল গঠন করার কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন সকালে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী জনাব আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেবের কাছ থেকে একটি টেলিগ্রাম আসে। টেলিগ্রাম পেয়ে তিনি ঢাকা যান এবং (বাকশাল) যুবলীগের সুনামগঞ্জ জেলার Secretary নিযুক্ত হন।
জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ উপজেলা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে ১৯৮৪ সালের প্রথম দিকে তিনি জগন্নাথপুর উপজেলা আদালতে চলে যান এবং ১৯৯০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি জগন্নাথপুর উপজেলা সহকারী জজ আদালতে সরকারী কৌশলী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। জগন্নাথপুর উপজেলায় থাকাকালীন সময়ে তিনি Diabetics- এ আক্রান্ত হন।
১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ছেলে-মেয়ে সহ বিলাত চলে যান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আইন পেশায় যোগদান করার অনুমতি চাইলে তিনি লন্ডন GRAYS BAR-At-LAW এ BVe অর্থাৎ BAR-At-LAW করার জন্য অনুমোদিত হন। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর খারাপের দিকে যাওয়ায় একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও করতে পারেন নাই।
পরে তিনি দেশে চলে আসেন এবং সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতে আবার আইন পেশা শুরু করেন এবং ১৯৯৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলা বার কাউন্সিলের Secretary নির্বাচিত হন। Diabetics- – এর জন্য তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। অবশেষ চিকিৎসার জন্য ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাসে তিনি London চলে যান।
Diabetics – এর কারণে তার Both Kidneys Damage হয়ে যায় এবং ২০০০ সালের ১৪ই মার্চ London Hospital এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তাঁর ছেলে-মেয়েরা সবাই লেখাপড়ায় আছে। বড় মেয়ে Honours mn Medical Bio-Technology তে Masters করে Mancester General Hospital Clinical Scientist হিসাবে কর্মরত ছিল। বর্তমানে শিক্ষক হিসাবে কর্মরত আছে। দ্বিতীয় মেয়ে Barriter-At-Law করে লন্ডনে আইন পেশায় নিয়োজিত আছে। তৃতীয় মেয়ে Honours mn International TR Law তে Masters করে Tower Hamlet Refugee Law Center এ Case Warifer হিসাবে কর্মরত ছিল। বর্তমানে Solicitor পেশায় নিয়োজিত আছে।