পুলক রাজ
বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য নয়, মনের জন্যও খাদ্য প্রয়োজন। পাঠাগার মানুষের ক্লান্ত ও বুভুক্ষু মনকে প্রফুল্ল করতে পারে। এজন্যই কথাসাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমি লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের ওপরে স্থান দেই। কারণ এ স্থলে লোকে স্বেচ্ছায় স্বাচ্ছন্দ্য চিত্তে স্বশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়; প্রতিটি লোক তার স্বীয়শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্কুল-কলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে, সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি আগেও বলেছি যে, লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়, তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।’
কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাস শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করেছে। স্কুল বন্ধ। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে আরও কত দিন কেউ জানে না। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আতঙ্কে বন্ধ জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারও। দীর্ঘদিন ধরে গ্রন্থাগার বন্ধ থাকায় বই পড়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে। তবে গ্রন্থাগারের অন্যান্য দাপ্তরিক কার্যক্রম চলেছে নিয়মিত। শুধু নেই পাঠকদের মিলনমেলা। বই না পেয়ে মুশকিলে পড়েছেন বইপ্রেমী, শিক্ষার্থী, চাকরীপ্রার্থীরা।
জানা যায়, জেলা সরকারি গ্রন্থাগারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রায় ১ হাজার বই রয়েছে। রয়েছে রবীন্দ্র রচনাবলী, চাকুরি প্রার্থীদের সহায়ক প্রায় ২০০ বই সহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় ২৮ হাজার বই। গ্রন্থাগারে বইয়ের বেশিরভাগ পাঠকই ছিলেন শিক্ষার্থী। এছাড়াও দৈনিক পত্রিকার মধ্যে প্রথমআলো, সমকাল, কালেরকন্ঠ, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, ইনকিলাব, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, ডেইলি স্টার রাখা হয় প্রতিদিন। করোনা সংক্রমণের পূর্বে গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ পাঠক আসতেন। গণগ্রন্থাগারে ১৪৮ জন নিবন্ধিত সদস্য রয়েছে। তবে এর বাইরেও অনেকে এসে পড়াশোনা করতেন। গণগ্রন্থাগারে এসে পড়াশোনা করতে কোন সদস্য পদ নিতে হয় না। তবে যারা সদস্য হন, তারা বাসায় বই নিয়ে পড়তে পারেন।
পাঠক সৌমিত্র সাগর বললেন, গণগ্রন্থাগার বন্ধ থাকায় ঠিক ভাবে পড়াশোনা করতে পারছি না। চাকরির কোন ধরনের আপডেট বই পাচ্ছি না। আগে গণগ্রন্থাগার সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকতো। ফলে সব ধরনের ছাত্র ছাত্রীরা এসে পড়াশোনা করতে পারতো। গণগ্রন্থাগার খোলা থাকা অবস্থায় আমি কোন দিন অনুপস্থিত থাকিনি, প্রতিদিন যেতাম। আপডেট পাওয়ার জন্য বই পড়া আমার নেশা হয়ে গিয়েছিলো। আমরা যারা গণগ্রন্থাগারে এসে পড়াশুনা করতাম আমাদের সবার দাবি স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণগ্রন্থাগার খুলে দেওয়া হোক।
পাঠক সনি চন্দ বলেন, দীর্ঘ দেড় বছর ধরে করোনা ভাইরাসের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গণগ্রন্থাগারও বন্ধ রয়েছে। যখন খোলা ছিলো তখন আমি সময় পেলেই গণগ্রন্থাগারে পড়াশোনা করার জন্য যেতাম। চাকরির আপডেট খবর পেতাম। এরকম চলতে থাকলে মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরা ঝরে পরবে। অনেকে আবার পড়াশোনা বাদ দিয়ে দিয়েছে।
পাঠক সায়লা রহমান বলেন, করোনা ভাইরাসের জন্য গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারও বন্ধ রয়েছে। আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা কিভাবে করবো। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে অন্তত গণগ্রন্থাগার খোলে দেওয়া উচিত। শহরের অলিগলিতে তো মানুষের অকাজে আড্ডাবাজি করছে, সামাজিক দূরত্ব মানছে না। আমরা তো সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে গণগ্রন্থাগারে পড়াশোনা করতে পারতাম। তাহলে কেন গণগ্রন্থাগার বন্ধ থাকবে। শহরের জগৎজ্যোতি পাঠাগারও সকালে বন্ধ থাকে। সারাদিন যদি খোলা থাকতো তাহলে তো এই সমস্যায় পড়তে হতো না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে গণগন্থাগার দ্রুত খোলে দেওয়া হোক।
পাঠক জাহেদ আহমেদ বলেন, গণগ্রন্থাগার খুলে দিলে আমার জন্য ভালো হতো। পড়াশোনা করতে পারতাম।
সুনামগঞ্জ জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের প্রধান লাইব্রেরীয়ান আনিছুর রহমান বলেন, জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার খোলা থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই ভালো হতো। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার খুলে দেওয়া হবে না। সরকারি নির্দেশনা আসা মাত্রই সকলে গণগ্রন্থাগারে পড়াশোনা করতে আসতে পারবেন।
তিনি বলেন, পাঠকদের পদচারনা না থাকলেও প্রতিদিন দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে। তবে দাপ্তরিক কাজ করতেও সমস্যায় পড়তে হয়। আমি আর নিরাপত্তা প্রহরী ছাড়া আর কেই নেই। ৬ টি শূন্য পদ পূরণ হলে আমাদের জন্য ভালো হবে। আমি একা একা কেমন করে এত বড় প্রতিষ্ঠান সামাল দেবো। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, সুনামগঞ্জ চালিয়ে আসছি।
- দক্ষিণ সুনামগঞ্জে মন্দিরে ঢুকে মুর্তির উপর পা রেখে ফেসবুকে ছবি পোস্ট
- সোমবার থেকে সীমিত, বৃহস্পতিবার থেকে সর্বাত্মক লকডাউন


