কবিতাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার বানিয়েছেন সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠন আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে তারা সুনামগঞ্জ শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিলেন গত বৃহষ্পতিবার। আবৃত্তি করেছেন তারা একক ও দলীয়ভাবে। নারী অধিকার উপ কমিটি নামে আরেকটি সংগঠনও ছিলো তাদের সহযোগী। আমরা সব সময় বলি, সংস্কৃতিই আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রধানতম উপকরণ। বিভাজন, বৈষম্য, অবিচার, কুসংস্কার রুখতে সংস্কৃতি এক অবিকল্প হাতিয়ার। যুগে যুগে আমরা দেখেছি যেকোনো ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনৈতিক শক্তির সমান্তরালে অবস্থান করে উপযুক্ত ভূমিকা রেখেছে সাংস্কৃতিক শক্তি। মূলত বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় এতো গভীরে প্রোথিত, এর গভীরতা এতো বেশি, এর প্রকাশভঙ্গী এতো হৃদয়গ্রাহী, এর চেতনা এতোটা মানবিক ও সাম্যের, নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা এতোটা প্রবল; যে কারণে যেকোনো সংকট উত্তরণের জন্য আমরা এই সংস্কৃতির নিবিড় ছায়াতলে আশ্রয় নেই। বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রটি ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ও চরম বৈষম্যমূলক শাসন ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে গঠিত হয়েছে তার পিছনে প্রধান ভূমিকা ছিলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যে জাতিগত ঐক্য গড়ে উঠেছিলো সেই ঐক্যের শক্তিতে আমরা বার বার পরাধীনতা ও অপশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছি এবং সফলকাম হয়েছি। তাই অতীতে বিভিন্ন শাসক আমাদের এই ঐক্যের জায়গাটিকে ভাঙতে নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার মধ্য দিয়ে, ধর্মীয় পরিচয়ে ভেদাভেদ তৈরি করে, রবীন্দ্রচর্চাকে নিষিদ্ধ করে; এই প্রয়াস চালু ছিলো সবসময়। এখনও আছে। বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানকে সুকৌশলে চর্চা-রহিত করে আমাদের ভিতরের যে উদারতা সেটিকে রুদ্ধ করে দেয়ার প্রয়াস এখনও চালু রয়েছে। রয়েছে বলেই, স্বাধীন এই ভূখ-ে, এই জাতিরাষ্ট্রে- ধর্মীয় পরিচয়ে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়। আত্মপরিচয়ের এমন অবনমন থেকে মুক্তি পেতে আমরাই আবার সংস্কৃতিকেই উপরে তুলে ধরি। সুনামগঞ্জের আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগটি এমন একটি অন্তর্গত শুভ-আকাক্সক্ষা থেকেই আয়োজিত হয়েছে। জয় হোক এই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রার।
নানাভাবে আমরা সাংস্কৃতিক অনুশীলন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমরা উদার আকাশের নীচে উন্মুক্ত পাখি হওয়ার পরিবর্তে শামুকের খোলশের ভিতর ঢুকে গিয়ে নিজেদের এক একটা পৃথক জগৎ তৈরি করে চলেছি। আমরা শুধুমাত্র জন্মগত পরিচয়ের কারণে একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। বিভাজনকে উস্কে দিচ্ছি। সমাজে বিরাজিত অর্থনৈতিক বৈষম্যকে উপেক্ষা করে তথাকথিত ধর্মীয় বৈষম্য তৈরির এক জ¦লন্ত চুলোয় জ¦ালানী দিয়ে চলেছি। এই জাতিকে নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার এই সুচতুর চেষ্টাটি একেবারে হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা অপশক্তিটি সর্বদাই এই জাতিবিনাশী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলো। এদের প্রতিহত করার সামাজিক শক্তি যখনই কিছুটা দুর্বল হয়ে যায় তখনই এরা দাপুটে হয়ে উঠে। বাংলাদেশের স্বাধীন, উদার ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রকে ওই অপশক্তি নষ্ট করে দিতে সদা তৎপর থাকে। এর বিরুদ্ধে নিজেদের স্বকীয়তাকে বাঁচিয়ে বিশ^সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি চর্চার জায়গাটিকে ক্রমাগত শক্তিশালী করে তোলতে হবে। মনে রাখতে হবে বাঙালি সাংস্কৃতিক শক্তির অন্তনির্হিত শক্তি এতোটাই প্রবল যে, যেকোনো আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা সেখানে সংরক্ষিত আছে। এই দেশ বার বার বিদেশি শাসন-শোষণের অধীনে থাকার পরও আমরা সেই জুরে এখনও পৃথক সত্ত্বা নিয়ে টিকে রয়েছি।
আমাদের সংগ্রাম জারি থাকুক অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের আরও যোগ্য করে তোলার জন্য আমাদের সংগ্রামী প্রয়াস সর্বদা জারি থাকুক। মানুষের পরিচয়কে মহিমান্বিত করতে আমাদের অভিযাত্রা আরও এগিয়ে যাক। আর এসব কিছুই হোক আমাদের উদার সংস্কৃতির অন্তর্গত মানবিকতা দিয়ে।

