সু.খবর ডেস্ক
বছর খানেক ধরে দেশে জঙ্গিদের হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মাস তিনেক ধরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর নাম আলোচিত হচ্ছিল। তাঁকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ বলেছে, গুলশানে হামলার সমন্বয়ক বা মাস্টারমাইন্ড এই তামিম চৌধুরী। শনিবার নারায়ণগঞ্জে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হওয়ার পর তামিম চৌধুরীর অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়েছে বলে ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ নাম দিয়ে গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় একটি বাড়ির তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট। এই অভিযানে নিহত হয়েছেন তিনজন। তাঁদের একজন কানাডাপ্রবাসী তামিম চৌধুরী। বাকি দুজনের পরিচয় গত রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
.তবে রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, গত রাতে নিহত জঙ্গিদের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁর নাম তাওসিফ হোসেন, বাসা ঢাকার ধানমন্ডিতে।
এই তাওসিফ চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি নিবরাস ইসলামের (গুলশান হামলায় নিহত) সঙ্গে বাড়ি ছেড়েছিল। ওই দিনই ধানমন্ডি থানায় নিখোঁজ হিসেবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল পরিবার। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। র্যাবের প্রকাশিত নিখোঁজদের তালিকায়ও তাওসিফের নাম ছিল।
পুলিশ সূত্র থেকে জানা গেছে, নিহত আরেকজনের নাম ফজলে রাব্বী। তাঁর বাড়ি যশোরের সদর উপজেলার কিসমত নোয়াপাড়ায়। ফজলে রাব্বী নামের যশোর এমএম কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র গত এপ্রিল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। জানতে চাইলে এই ফজলে রাব্বীর মা ও বোন মুঠোফোনে গত রাতে বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত না। তবে শুনেছি, রাব্বী নারায়ণগঞ্জে নিহত হয়েছে।’ যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার ভাস্কর সাহাও একই কথা বলেন।
তামিম চৌধুরী। নিহত হওয়ার পর তাঁর ছবি (ডানে) প্রকাশ করে পুলিশ
জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমে এটাকে বিশাল সাফল্য হিসেবে দেখছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বাংলাদেশ সফরের ৪৮ ঘণ্টা আগে এই অভিযান সরকারের ওপর মহলে বিশেষ গুরুত্ব ও প্রশংসা পেয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অভিযানের জন্য পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, জঙ্গি খতম হয়েছে, দেশ অভিশাপমুক্ত হয়েছে।
এদিকে গতকাল কানাডার পত্রিকা দ্য স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর নিহত হওয়ার বিষয়টি কানাডার সরকার এরই মধ্যে অবহিত হয়েছে। এ ব্যাপারে আরও তথ্যের জন্য তারা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ওই দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর কাজের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এক বিবৃতিতে এ কথা জানায়।
নারায়ণগঞ্জে অভিযান সম্পর্কে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তামিমকে ধরার জন্য মূল অভিযানের পরিকল্পনা করতে পুলিশ প্রায় দুই দিন সময় নিয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটা থেকে চারটার দিকে প্রথমে পুলিশের এলআইসির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এরপর পুলিশ সদর দপ্তর, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, সোয়াট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট ঘটনাস্থলে হাজির হয়। গতকাল ভোর ছয়টা-সাড়ে ছয়টার দিকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একটি দল গিয়ে বাড়ির মালিককে তাঁর বাড়িতে জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে জানায়। এরপর তিনতলা ওই বাড়ির সব কটি ফ্ল্যাটের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর ওই বাড়ির পাশের একটি চারতলা বাড়ির ছাদে পুলিশ অবস্থান নেয় এবং ওই বাড়িটি খালি করে ফেলা হয়। এরপর বাড়ির মালিকের মাধ্যমে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করে বেরিয়ে আসতে বলা হয়। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পুলিশ হ্যান্ডমাইকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলে। জবাবে তারা গ্রেনেড ছোড়ে ও গুলি করে এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল।
অভিযানের সময় বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সকাল নয়টার দিকে অভিযান শুরু হয়। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়েছে। ওই বাড়িতে তিনজন ছিলেন। তিনজনই নিহত হয়েছেন।
অভিযানে থাকা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেন, অভিযানের সময় তামিমের সঙ্গে গ্রেনেড (হাতে তৈরি) এবং তাঁর দুই সহযোগীর একজনের হাতে পয়েন্ট ২২ বোরের পিস্তল, অন্যজনের হাতে একে-২২ রাইফেল ছিল (একই ধরনের অস্ত্র ছিল গুলশানে হামলাকারীদের কাছেও)। তাঁরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন এবং দুটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটান। পরে পাশের একটি বাড়ির টিনের চালে দুটি এবং জঙ্গিদের ফ্ল্যাটের ভেতরেই দুটি গ্রেনেড পাওয়া যায়। পরে গ্রেনেডগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়।
অভিযান শেষে তোলা ঘটনাস্থলের যেসব ছবি পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায়, দুই ঘরের মাঝের একটি দরজার মাঝামাঝি উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছেন তামিম চৌধুরী। তাঁর মুখের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি স্পষ্ট। মেঝেতে ভাসা-ভাসা রক্ত ও পানি। আরেকটি ঘরের মেঝেতে একজন চিত হয়ে পড়ে রয়েছেন, গলায় ঝোলানো একটি একে-২২ রাইফেল বুকের ওপর। আরেকজন কাত হয়ে পড়ে রয়েছেন। রক্ত-পানিতে মেঝে মাখামাখি। তাঁদের ঘরে কোনো আসবাব নেই। একটি মাত্র টেবিল, তার ওপরে কিছু বইপত্র, দুরবিন ও কাপড় দেখা গেছে। টেবিল ল্যাম্প ও ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ভাঙাচোরা টুকরা পড়ে আছে মেঝেতে। নিহত তিনজনের পরনেই ছিল কালো বা ছাই রঙা গেঞ্জি এবং কোমরে বেল্টসহ প্যান্ট।
অভিযানে অংশ নেওয়া আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তিন কক্ষের ওই বাড়িতে একটি টেবিল, কিছু কাপড়চোপড়, ল্যাপটপ ও বইপত্র পাওয়া গেছে। অভিযানের সময় তাঁরা তাঁদের ল্যাপটপ ও হার্ডডিস্ক ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ছাড়া তাঁদের মুঠোফোনগুলোও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
দুপুরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়া হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী ‘নব্য জেএমবি’র নেতা। পুলিশ সদর দপ্তর তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তিনি বলেন, পুলিশের গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল যে নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছেন তামিম চৌধুরী। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সোয়াট টিমকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান শুরু করে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ও র্যাব তাদের সহযোগিতা করে। মূল অভিযান চলে এক ঘণ্টা। অভিযান শেষে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখা যায়, তিন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তাদের একজনের চেহারার সঙ্গে পুলিশের কাছে থাকা তামিম চৌধুরীর ছবির হুবহু মিল রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হয়, তিনি তামিম চৌধুরী।
আইজি বলেন, পুলিশ জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তারা পুলিশের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পুলিশের ওপর চার-পাঁচটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং একে-২২ রাইফেলের গুলি ছোড়ে। জঙ্গিদের আস্তানার আশপাশের ভবন থেকে পুলিশ স্নাইপার রাইফেল দিয়ে গুলি ছোড়ে। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হিট স্ট্রং-২৭’।
আইজি আরও বলেন, ‘আমরা আগে নিশ্চিত হয়েছি, সেখানে কোনো নারী ও শিশু আছে কি না। নারী ও শিশু নেই—এটা নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে কোনো আহত নেই। তিনজনই নিহত।’ তিনি বলেন, গুলশানে হামলার পর ওষুধ কোম্পানির চাকুরে পরিচয়ে জঙ্গিরা এই বাড়ি ভাড়া নেয়।
ঘটনাস্থলে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তামিম চৌধুরীর চ্যাপ্টার শেষ হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তামিমের সবচেয়ে বড় সহযোগীও এই অভিযানে নিহত হয়েছে।’ তামিম নিহত হওয়ায় তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে কি না, সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা হুজুগে কাজ করি না। গোয়েন্দারা সঠিকভাবে কাজ করছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বিকেলে রাজশাহীর বাগমারার ভবানীগঞ্জ নিউমার্কেটে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জঙ্গিবিরোধী সমাবেশ শেষ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘তামিমের চ্যাপ্টার আজ শেষ হয়েছে। অচিরেই জিয়ার চ্যাপ্টার শেষ হবে। প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’
প্রসঙ্গত, তামিম চৌধুরী এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কথিত সামরিক শাখার প্রধান ও চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউল হককে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৬ জুলাই ভোরে ঢাকার কল্যাণপুরে একটি বাড়িতে পুলিশের অভিযানে নয় জঙ্গি নিহত হয়। ওই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়ির মালিক নুরুদ্দীন দেওয়ানসহ ১০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন। জঙ্গিদের লাশ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত বা অন্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হবে।
- অনৈতিক এসি ব্যবহার- ভোগান্তিতে ৭ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক
- দোয়ারাবাজারের ২ ইউনিয়নকে বাল্যবিয়ে মুক্ত ঘোষণা


