ভুভুজেলা ভীষণ জ্বলা হয়ে উঠেছে শান্তিগঞ্জে। শান্তিগঞ্জের শান্তি বিনষ্টকারী এই শব্দযন্ত্রের ব্যবহার বন্ধের দাবি উঠেছে সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে। নির্বাচনি প্রচারণায় দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের জন্য অনিষ্টকারী এই ভুভুজেলা। সুদূর আফ্রিকা থেকে এই বাঁশি নামক শব্দ দূষণযন্ত্রটি আমাদের দেশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো কোনো এক বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময়। যুগটা এখন বৈশ্বিক। কোনো কিছুকেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে রাখা যায় না। প্রবেশ অনুপ্রবেশ চলতেই থাকে। নতুবা আমরা যে বাঁশের বাঁশির মোহন শব্দে মোহাচ্ছন্ন হতাম, যে সুরজাদু তৈরি করে থাকে আমাদের কত শত রকমের মোহন বাঁশি, যে বাঁশিতে রাধারানী কাতর হন কৃষ্ণবিরহে, রোদের ক্লান্তি ভুলে মাঠের রাখাল, ঘর থেকে বেরিয়ে আসে প্রণয় পাগল প্রাণ, যে বাঁশির সুরে আমাদের আবেগের দরোজা খুলে দেয়; সেই বাঁশিরই এক বিভৎস রূপ যা কিনা ওই ঘন জঙ্গলের আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অবলীলায় চলে আসতে পারে আমাদের এই নরোম কোমল শ্যামল বাংলাদেশে। গ্রহণ ও বর্জনের সীমারেখা আমরা ভুলে বসে আছি। কবিগুরুর ‘মিলাবে আর মিলিবে’ তত্ত্বকথাটি ভুভুজেলার কাছে এমন অসহায় হয়ে উঠতে পারে বলে আমরা ভাবতে পারি না। সময়টা এখন নিজস্বতা ও স্বকিয়তা বিসর্জনের। আমরা নিজস্ব উৎস থেকে ক্রমাগত দূরে সরে গিয়ে ঘরের ঠাকুর ফেলে বাইরের কুকুর নিয়ে মেতে থাকতে ভালোবাসি। তাই তো আফ্রিকার সংস্কৃতির জন্য মানানসই যে শব্দযন্ত্র তা আমাদের জন্য বিরক্তিকর হলেও সেটি ব্যবহারকেই সপ্রতিভতা মনে করি। এই আত্মবিচ্যুতি দূর করা উচিৎ।
শান্তিগঞ্জে ভুভুজেলার ব্যবহারের খবর পাওয়া যায় মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন। এ নিয়ে সংবাদেপত্রে খবর প্রকাশ হয়েছিলো। সকলেই ধারণা করেছিলেন নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেলো নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর দিনই বিভিন্ন প্রার্থী এই ভুভুজেলা ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন। ভুভুজেলার বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিক নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন আমাদের প্রতিবেদক। তিনি বিজ্ঞানসম্মত তথ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন এই অতিরিক্ত শব্দ তৈরিকারী ভুভুজেলা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কত ধরনের ক্ষতি করে চলেছে। স্বাস্থ্যের এই ক্ষতি বাদ দিলেও মানুষের বিরক্তি ও দৈনন্দিন চলাফেরার সমস্যা তৈরির দিকটিও বেশ দীর্ঘ। সবচাইতে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শোভাযাত্রায় প্রার্থীর নাম কিংবা প্রতীক নিয়ে কোনো জয়ধ্বনি উচ্চারিত হয় না। শোভাযাত্রায় অনবরত বাজানো হয় ভুভুজেলা। যেনবা অতিরিক্ত শব্দেই আকৃষ্ট হবেন নির্বাচকমন্ডলী আর শোভাযাত্রার প্রতীকের প্রতি বিগলিত হয়ে ভোটের বাক্স ভরে দিবেন। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে যা আমাদের প্রতিবেদনে যুক্ত মানুষের বক্তব্য থেকেও সমর্থন করে, সেটি হলো শোভাযাত্রার ওই তীব্র শব্দ মানুষের চরম বিরক্তি তৈরি করছে। এই বিরক্তি প্রার্থী ও প্রতীকের প্রতি অনুরাগের বদলে বিরাগ সৃষ্টি করছে। প্রার্থীদের বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেয়ার সময় এসেছে। যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তারা জনসেবার গাল ভরা বুলিটিকে সামনে নিয়ে আসেন। সুতরাং যে কাজ জনগণকে বিরক্ত করে সেই কাজ করা থেকে বিরত থাকাই নিজেকে সর্বোত্তম প্রমাণ করার উৎকৃষ্ট পন্থা বলে আমরা মনে করি।
নির্বাচনি আচরণবিধি অনুসারে যেকোনো ধরনের শোভাযাত্রা বা জনভোগান্তি তৈরিকারী কর্মকান্ড নিষিদ্ধ। তাহলে শান্তিগঞ্জে ট্রাকে চড়ে ভুভুজেলা বাজিয়ে সকলের চোখের সামনে এই যে আচরণবিধি লংঘন করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে নির্বাচনি কর্মকর্তাগণের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কই? আইন না মানার কিছু মানুষ সবসময় সমাজে থাকে বলেই আইন ও আইনরক্ষী নিয়োজিত হন। আইনরক্ষী যদি আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেন তাহলে ক্রমাগত উৎপাত বাড়বে। শান্তিগঞ্জের শান্তি বজায় রাখতে আমরা তাঁদের উপযুক্ত ভূমিকা কামনা করি।


