আকরাম উদ্দিন
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় জন্ম নিবন্ধন করতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নাগরিকেরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করতে লাগছে জন্ম নিবন্ধন। এই জন্ম নিবন্ধন করতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্বস্ব এলাকার নাগরিকেরা। জন্ম নিবন্ধনের ভোগান্তি কমিয়ে আনতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আরও সহজ পদ্ধতি গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভোগান্তির শিকার নাগরিককেরা।
জানা যায়, একজন পিতা যখন নিজ সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করতে যান, তখন পিতা-মাতা উভয়ের জন্ম নিবন্ধন করতে হয়। পরে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করা সম্ভব হয়। এই জন্ম নিবন্ধনের কাজ করতে গিয়ে একজন কম্পিউটার অপারেটরকে পড়তে হয় নানা সমস্যায়।
জন্মনিবন্ধন কাজ সম্পাদনে সার্বক্ষণিক থাকে সার্ভারের সমস্যা, ইন্টারনেটের সমস্যা এবং বিদ্যুতের সমস্যা। একারণে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার আসা-যাওয়া করতে হয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারে। এতে সময়ও লাগছে বেশি, আসা-যাওয়ার খরচও লাগছে বেশি। সাধারণ জনগণ নিজের দিনমজুরী কাজ, অফিসের কাজ ছেড়ে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে যেতে হচ্ছে ডিজিটাল সেন্টারে। এভাবে একেক জনের জন্ম নিবন্ধন কাজ সম্পাদন করতে লাগছে সর্বনি¤œ ৭ দিন, সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন।
জন্ম নিবন্ধন করতে এসে ভোগান্তির শিকার একাধিক ব্যক্তি জানান, তাদের সন্তানদের ভর্তি করতে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনের চাপ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। ডিজিটাল সেন্টারে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও নানা জটিলতায় যথাসময়ে জন্ম নিবন্ধন পত্র হাতে পাচ্ছেন না তারা। নেই কোনো শৃংখলাও, এলাকায় যার প্রভাব বেশি, তারা ডিজিটাল সেন্টারে পরে এসে আগে নিয়ে যান জন্ম নিবন্ধন। এই প্রতিযোগিতায় পড়ে অনেকে ত্যক্ত বিরক্ত হচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা জহুরা আক্তার বলেন, আমি ও আমার স্বামীর জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে অন্তত বিশ দিন সময় লেগেছে। অনলাইনে ফরম ফিলআপ সহ আমার খরচ হয়েছে ৪শ’ টাকা। এই জন্ম নিবন্ধন করতে আমাকে যোগাযোগ করতে হয়েছে ৪ বারেরও বেশি।
সুরমা ইউনিয়নের মইনপুর গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে আসা-যাওয়া করে ছেলে-মেয়ে ৩ জনের জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে নিজে ও স্ত্রীর জন্ম নিবন্ধন করতে হচ্ছে। এখনও একজনের জন্ম নিবন্ধন হয় নি।
এই ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার বলেন, আমার মেয়ের জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে ৬ দিন আসতে হয়েছে। তবুও শেষ হয় নি। হয়তো দুই একদিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন হাতে পেতে পারি।
কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা আলাল মিয়া বলেন, আমার ছেলের জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে দশ দিন ধরে আসা-যাওয়া করে আসছি। এখনও হয়নি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ গ্রামের শফিকুল আলম বলেন, আমার মেয়ের জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে পনের দিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে আসা-যাওয়া করছি। উদ্যোক্তা ও ইউপি সচিব জানিয়ে দেন বিদ্যুৎ নেই, নেট নেই, সার্ভারে ঢুকতে পারছি না ইত্যাদি নানা সমস্যার কথা। একই এলাকার বাসিন্দা সিরাজুর রহমান সিরাজও একই কথা বলেন।
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুছ সাত্তার বলেন, জন্ম নিবন্ধনে সরকার এই পদ্ধতি চালু করার পর থেকে মারাত্মক ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছি। সারা দিন ইউনিয়নের নাগরিকদের নানা ক্ষেভের কথা শুনতে হচ্ছে আমাকে। প্রতিদিন অন্তত: ৩-৪ শ ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। তারপরও মানুষ আমার উপর অসন্তোষ্ট। আমার কিছুই করার নেই। সহজ পদ্ধতি চালু করার দাবি আমাদের।
কুরবাননগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে জন্ম নিবন্ধন করতে নাগরিকদের মারাত্মক ভোগান্তি হচ্ছে। একজনের জন্ম নিবন্ধন সম্পাদন করতে সপ্তাহখানেক লেগে যায়। সার্ভার সমস্যা, নেট সমস্যা, থাকে না বিদ্যুৎ। এসব সমস্যায় মানুষ হতাশ হয়ে অনেকে বাড়ি ফিরছেন।
কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ূম বলেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা ও ইউপি সচিবকে একশ’ টাকা দিতে হয়। সময় লাগে অনেক। প্রায় ১৫ দিনও লেগে যায়। আবার যদি শিক্ষার্থীর বয়সে ভুল থাকে তখন তো ভোগান্তির শেষ নেই। অনেক শিক্ষার্থীর বয়স কম থাকায় ভর্তি নিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়েছেন পিতা-মাতা। জন্ম নিবন্ধন পদ্ধতি সহজ হলে ঝামেলা, দুশ্চিন্তা, যাতায়াত খরচ সবই কমবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে জন্ম নিবন্ধন করতে লাগে ৫০ টাকা। ইউনিয়ন পরিষদ সচিব কাগজপত্র ঠিক করে দেন, এতে আরও কিছু খরচ দিতে হয়। সবমিলিয়ে একশ’ টাকা লাগে। মানুষ এক সাথে জন্ম নিবন্ধন করে নিতে আসায় এই বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে। এটি থাকবে না।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার আরপিননগরের বাসিন্দা ফয়েজুর রহমান বলেন, আমার ভাতিজির জন্ম নিবন্ধনের জন্য ৫ বার যেতে হয়েছে পৌরসভার ডিজিটাল সেন্টারে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার সচিব মো. ইসহাক ভূঁয়া বলেন, একটি জন্ম নিবন্ধন করতে কত সময় লাগবে তা বলা যাবে না। সম্পূর্ণ সার্ভারের উপর নির্ভর করে। নেট ভাল থাকলে, বিদ্যুৎ থাকলে অল্প সময়ে জন্ম নিবন্ধন করে দেওয়া সম্ভব। পৌরসভার মেয়র সাহেব সকলকে নির্দেশ দিয়েছেন, জন্ম নিবন্ধন করতে এসে কোন নাগরিক যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয়। মেয়র সাহেব অনেক রাত পর্যন্ত পৌরসভায় বসে থেকে জন্মনিবন্ধনে স্বাক্ষর করেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমরান শাহরিয়ার বললেন, নীতিমালায় আছে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে এক জনের জন্ম নিবন্ধন করে দিতে হবে। এখন ইউনিয়নের নাগরিকেরা এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন জন্ম নিবন্ধন করতে, সবাইকে তো এক সাথে জন্ম নিবন্ধন করে দিতে পারবে না। এজন্য ধৈর্য্য ধরে জন্ম নিবন্ধন করে নিতে হবে। নীতি মালায় আছে শূন্য থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে বিনামূল্যে শিশুদের জন্ম নিবন্ধন নেয়া যাবে।


