দুই পক্ষের মিছিল-সমাবেশে উত্তেজনা তাহিরপুর উপজেলা সদরে

বিশেষ প্রতিনিধি
তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীর কিছু অংশ থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে উপজেলাজুড়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। যাদুকাটা নদীতে কর্মরত শ্রমিকরা বালু উত্তোলন করার পক্ষে উপজেলা সদরে বিক্ষোভ করেছে। অপরদিকে, উপজেলার শনির হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ ছোট বড় অসংখ্য হাওরপাড়ের জেলে কৃষকদের পক্ষে মাহারাম নদীর বেড়ী বাঁধের পাশ থেকে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।
জানা যায়, জেলার সর্ববৃহৎ বালু মহাল যাদুকাটা নদীর ইজারাকৃত বালু মহালের পাশ থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে গেল ৩ নভেম্বর তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল জেলা প্রশাসকের নিকট অনুরোধপত্র দেন। তিনি অনুরোধপত্রে উল্লেখ করেন, ইজারাকৃত বালু মহালের সীমানা অতিক্রম করে শেফ মেশিন (ছোট আকারের বোমা মেশিন) চালিয়ে অপরিকল্পিতভাবে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কারণে নদীর পাড়ের জনবসতি, মাহারাম নদীর বেড়ী বাঁধ, ঘাগটিয়া গুচ্ছ গ্রাম, পর্যটকদের আকর্ষণীয় শিমুল বাগান, লাউড়েরগড় বাজার, বিন্নাকুলী, লামাশ্রম, গড়কাঠি, ঘাগড়া গ্রাম বিলীন হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি মানুষের ঘরবাড়ি, প্রকৃতি-পরিবেশ ও ভাটির হাওরের ফসল রক্ষার্থে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানান।
অনুরোধপত্রের অনুলিপি পরিকল্পনামন্ত্রী, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠান তিনি।
এই অনুরোধপত্র দেবার পর মঙ্গলবার যাদুকাটা নদীতে টাস্কফোর্সের অভিযানে ১৬ জন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অবৈধ সেফ মেশিন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই অভিযানের পর শুক্রবার সকালে বালু পাথর শ্রমিকরা তাহিরপুর উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল করে। বিক্ষোভকারীরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়।
মিছিলকারীদের নেতৃত্ব দেন- হাকিকুল ইসলাম, মাসুক সরদার, শফিক সরদার, রুবেল সরদার, ইসমাইল সরদার, আক্তার সরদার, ইকরাম হোসেন, হযরত আলী প্রমুখ।
একইদিনে বেলা আড়াইটায় উপজেলা সদরের পূর্ব বাজারে মাহারাম নদীর বাঁধ সুরক্ষার দাবিতে তাহিরপুরবাসীর ব্যানারে সমাবেশ হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন- তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী মর্তুজা, তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন রেজা, যুবলীগ নেতা মিল্লাদ হোসেন, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল বাশার প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, যাদুকাটা সংলগ্ন মাহারাম নদীর বাঁধের পাশ থেকে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। এখান থেকে বালু উত্তোলন করলে বাঁধ হুমকির মধ্যে পড়বে। শনির হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ পুরো ভাটি অঞ্চলের বোরো ফসল হুমকির মধ্যে থাকবে।
উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল বাশার বললেন, লাখ লাখ কৃষকের জীবন-জীবিকার বিষয় যুক্ত মাহারাম নদীর বাঁধে। অথচ এই বাঁধের পাশ থেকে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। এজন্য তাহিরপুরবাসীর ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।
যাদুকাটা শ্রমিক সমিতির নেতা আব্দুস শহিদ বললেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সেফ মেশিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে আবেদন করায় শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে মিছিল বের করেছে। আমি ফেরানোর চেষ্টা করেছি। কেউ মানে নি, আমি মিছিলে যাই নি।
যাদুকাটা বালু মহালের ইজারাদার, জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি সেলিম উদ্দিন বললেন, যাদুকাটায় ড্রেজার মেশিন চলে না, কিন্তু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ড্রেজার মেশিন চলছে উল্লেখ করে বিভিন্ন স্থানে আবেদন করেছেন। এ কারণে শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত হয়ে মিছিল করেছে। মাহারাম নদীর মুখ থেকে বা মাহারাম নদীর পাশ থেকেও বালু উত্তোলন হয় না, এটিও মিথ্যা অপপ্রচার, কৃষকদের ক্ষেপানোর জন্য এটি করা হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, আমার অবস্থান মানুষের পক্ষে, লাখো কৃষকের ফসলি জমি রক্ষা, যাদুকাটার পাড়ের ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য আমি দায়িত্ব পালন করেছি। জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো অপরাধ হলে, আমাকে সেই অপরাধ করতে হবে। আমি জেলা প্রশাসকের কাছে যে অনুরোধপত্র দিয়েছি, সরেজমিনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গিয়েও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। সরেজমিনে যে কেউ গেলে আমার আবেদনের সত্যতা মিলবে।