প্রতিটি নির্বাচনে, সেটি যে পর্যায়ের নির্বাচনই হোক না কেন; প্রচুর সংখ্যক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে জামানত হারাতে দেখি আমরা। নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুসারে প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ ভোট না পেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী জামানত হারান। অর্থাৎ তাঁরা মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় জামানত স্বরূপ যে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেন তা আর ফেরৎ পান না। এতে সরকারের লাভ। যৎকিঞ্চিৎ হলেও সরকারি তহবিল স্ফীত হয় এ কারণে। এই বিবেচনায় যত প্রার্থী তত লাভ নীতির প্রতি অনুরক্ত হলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যখন জনপ্রতিনিধিত্বের দাবিদারদের এমন জনপ্রত্যাখ্যানের তথ্য সামনে আসে তখন এটি যেমন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর জন্য হয়ে উঠে চরম লজ্জাজনক তেমনি অন্যদের জন্যও হয় হাসির খোরাক। কেন এমন হয়? যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাঁরা একটা ন্যূনতম জনমর্থন নিয়েই তো জেতা-মরার লড়াইয়ের আসরে অবতীর্ণ হন। তাহলে কেন তাঁরা জামানত টিকিয়ে রাখার মতো ভোট পান না, এটি সত্যিই এক ধাঁধা বটে।
জেলার সদর উপজেলার ৯ ইউনিয়নে সদসমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ৬৩ জন। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে বুধবার প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে দেখা যায় এর মধ্যে ৩২ প্রার্থী জামানত খুইয়েছেন। শতাংশের হিসাবে ৫০ ভাগের বেশি সংখ্যক প্রার্থী জামানত টিকিয়ে রাখার মতো এক অষ্টমাংশ ভোটও পাননি। জামানত হারানো প্রার্থীদের মধ্যে সরকার দলীয় ডাকসাইটে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যাও ৪ জন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয় লাভের ইচ্ছার সাথে নির্বাচকম-লী ভোটারদের মনোভাবের মধ্যে এই যে বিপরীতমুখী অবস্থান সেটি কি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে কেউ টের পান না? ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো জানতে পারলে বোধ করি এরকম অসম অবস্থান লাভ করতে কেউই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতেন না। একেবারে চুলচেরা হিসাবটি না জানলেও মোটামুটি ধরনের হিসাবনিকাশ না করে কেউ নির্বাচন করতে আসেন সেটিও মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে এই হিসাব যে সর্বক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণ হয় না অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর জামানত হারানো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর মধ্য দিয়ে আরও প্রমাণ হয় সাধারণ মানুষের সাথে প্রার্থীদের যোগাযোগের জায়গাটি একেবারেই সংকুচিত। ভোটারদের মনোভাব বুঝার মতো জনঘনিষ্টতা তাঁদের নেই। ভোটাররা নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে এখন ভোটাধিকারের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ করেন এটি সত্য। এই সত্য জেনেই তো সকলে আসেন। আমরা দেখেছি যে প্রার্থী যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করতে পারেন না, যিনি শ্িক্ত সামর্থের প্রমাণ দিতে পারেন না, যিনি গ্রামীণ সমাজের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোগুলোকে নিজের অনুকূলে ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত নন; তারা প্রায় সকলেই জামানত হারান। অর্থাৎ মানুষ হিসাবে ভালো হলেও নির্বাচনে জিতে আসতে সেটি বড় কোনো উপাদান হয় না। বরং উল্টোটাই ঘটতে দেখি আমরা। আমাদের দেশে নির্বাচনের এই জটিল জায়গাটি ক্রমশ জটিলতর হয়ে উঠছে। এর বাইরেও কিছু মানুষের উপর নির্বাচনি-পাগলামো ভর করে, এরা নির্বাচন আসলে রক্তে এক ধরনের স্পন্দন অনুভব করেন। এরা তখন আমাদের চলমান নির্বাচনি সংস্কৃতি বেমালুম ভুলে বসে দাঁড়িয়ে যান কোনো একটি মার্কা নিয়ে।
তবে যারা জামানত খুইয়েছেন তারা সর্ব অর্থে জনসেবার অনুপযুক্ত এমন ভাবার অবকাশ নেই। অনেকে আছেন যারা সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন কিন্তু নির্বাচনে তিনি ভোট পান না। নির্বাচনে জিতে আসা আর জনসেবা করা এখন দুই ধরনের কাজ হয়ে গেছে। একে এক সুতোয় বাঁধতে পারলে যেমন জামানত খোওয়ানো প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা হ্রাস পাবে তেমনি ভালো প্রার্থীর জিতে আসার জায়গাটিও উন্মুক্ত হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে।
- বর্তমানে চীন বিশ্বে ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের রোল মডেল: পরিকল্পনামন্ত্রী
- জগন্নাথপুরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল

