বছর শেষে রীতি অনুসারে সালতামামি করার একটা প্রবণতা রয়েছে কিছু কিছু গণমাধ্যমের। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরও সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীক এমন সালতামামি আয়োজনের চেষ্টা করে। গতকাল জেলার শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে এমন একটি প্রতিবেদনে ফিরে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে শেষ হতে যাওয়া ২০২১ খ্রিস্টিয় সনে এই ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার। এর মধ্যে যেমন রয়েছে আনন্দের কিছু খবর তেমনি রয়েছে হতাশা বা বেদনারও কিছু খবর। তবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো জেলার শিক্ষার পরিসংখ্যান নিয়ে ছোট্ট একটি তথ্য। এই তথ্যটি জেলাবাসীর জন্য কোন সুখবর নয়। এবং এই তথ্য হঠাৎ পাওয়া কোন চমক জাগানিয়া তথ্যও নয়। বরং বলা ভাল এরকম একটি পরিসংখ্যানের লজ্জা নিয়েই আমরা সময় পার করে চলেছি বছর বছর। তথ্যটি হলÑ জাতীয় ক্ষেত্রে শিক্ষার হারের সাথে জেলার তুলনামূলক চিত্র। জাতীয় ক্ষেত্রে যেখানে শিক্ষার হার (স্বাক্ষরতা) ৭৫.২ শতাংশ সেখানে জেলায় এই হার ২০ থেকে ৪০ শতাংশের ভিতর উঠানামা করছে উপজেলা ভেদে। জেলার সর্বনিম্ন শিক্ষা হার শাল্লায় যা মাত্র ২০.১০%। সর্বোচ্চ স্বাক্ষরতার হার ধর্মপাশায় ৪০.৩০ শতাংশ। অর্থাৎ সুনামগঞ্জের সর্বোচ্চ স্বাক্ষরতাসম্পন্ন উপজেলাটিও জাতীয় হারের চাইতে ৩৫ শতাংশ নীচে। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের এমন অবস্থান চরম হতাশাজনক। সবচাইতে হতাশাজনক হলো- জেলার যারা দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব রয়েছেন তাঁদের এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যথা রয়েছে বলে আমরা বুঝতে পারি না। দায়িত্বশীল কারও মুখ থেকে শিক্ষার এই অধোগমন থেকে পরিত্রাণের জন্য কোন কথা শুনতে পাইনি আমরা। নিশ্চিতভাবেই শিক্ষার এই নিম্নাবস্থা জেলার সার্বিক উন্নয়নকে এক পাশে সরিয়ে রেখে হতাশার কদর্য চেহারাটিই সামনে নিয়ে আসতে পারছে।
জেলায় বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলার গালভরা উচ্চারণ আমরা শুনতে পাই। বিশ^বিদ্যালয় হচ্ছে, মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট হচ্ছে; কিন্তু মৌলিক জায়গায় উন্নতি করার উদ্যোগ কই? একেবারে গোড়া থেকে যদি উন্নয়ন শুরু করা না যায় তাহলে এইসব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করবে কারা? আমাদের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ জনগোষ্ঠীকে স্বাক্ষরতার বাইরে রেখে অন্য কোন উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। যেকোন ধরনের নিয়োগ বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় আমাদের ছেলে-মেয়েদের ছিটকে পড়ার দৃশ্য আমরা দেখি। বিসিএস বা অন্য কোন বড় নিয়োগে আমাদের সন্তানরা খুব বেশি সুযোগ পাচ্ছে না। এ থেকে প্রমাণ হয় শুধু পরিমাণগত দিক থেকেই নয় গুণগত দিক থেকেও শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।
করোনা মহামারী গত দুই বছর ধরে পুরো পৃথিবীকেই এক ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বিমুখ হয়ে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলে এবং প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা ভয়াবহ। এখন করোনার প্রকোপ কাটিয়ে উঠে শ্রেণিকক্ষকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে করোনা মহামারী আমাদের বহু শিক্ষার্থীকে ঝরিয়ে ফেলেছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। বহু শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। সুতরাং সামনের পরিসংখ্যানগুলো যে বর্তমান চিত্রের চাইতেও খারাপ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
যেকোন জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো শিক্ষার উন্নয়ন। ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করতে পারলেই কেবল টেকসই ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লাভ করা সম্ভব। এই চিরন্তন সত্যকে আমাদের নেতৃবৃন্দ যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করতে পারবেন তত মঙ্গল। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরই বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। শিক্ষার্থীদের ভিত্তি সঠিক ও মজবুতভাবে গড়ে দিলে সে নিজেই উচ্চ শিক্ষার দুয়ার খোঁজে নিবে। সুতরাং জেলার হতাশাজনক শিক্ষা পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় তা নিয়ে কার্যকর চিন্তা-ভাবনা করার জন্য আমরা জেলার দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানাই।

