ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশর পর)
কার্যত কেজু কীছু হয়ে উঠে নি। বিপরীতে যা হবার তাই হয়েছে, মেকলের এই চুঁইয়ে পড়া শিক্ষানীতি থেকে ভালো কীছু সাধারণ মানুষের জীবনপরিসরে চুঁইয়ে পড়ে নি, বরং সমাজে একটি বিশেষ শ্রেণি তৈরি করেছে, যে-শ্রেণিটি একাধারে মার্কস কথিত উদ্বৃত্তশ্রমের প্রত্যক্ষ শোষক ও সমাজরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রকের কায়েমি স্বার্থের তাঁবেদার এবং অনিবার্যভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে এই বিশেষ শ্রেণির (মেকলেচেলাদের) অবিমৃষ্যকারিতার পরাকাষ্ঠা প্রত্যক্ষ করা গেছে যখন বিপ্লবী রবি দামকে হত্যা করেছে পুলিশ, বন্দি ইলা মিত্রের গোপনাঙ্গে সদ্য সিদ্ধ-গরম ডিম সবলে প্রবিষ্ট করে দিতে কসুর করে নি একজন দারোগা, কিংবা ত্রিশ লক্ষ মানুষ হত্যা ও চারলক্ষাধিক নারীকে ধর্ষণের ইতিহাস সৃষ্টির পৌরহিত্য গ্রহণে একদল মানুষ পিছপা হয় নি। এরপরও অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না যে, একজন ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইনকে যেমন মেকলেচেলা বলে সহজে শনাক্ত করা যায়, বিপরীতে একজন মুনীর চৌধুরীকে সে-দৃষ্টিকোণ থেকে শনাক্ত করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না, তিনি ‘কবর’ নাটক লেখেন এবং প্রখ্যাত আমলা হলেও পাকিস্তানিরা তাঁকে তাদের অপকর্মের দোসর বানাতে পারে নি, যেমন দালাল বানাতে পেরেছিল সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইনকে। ইতিহাস সাক্ষী, এই মেকলেচেলারা পৌনে দুই শত বছরব্যাপী নিজেদের মেধাশ্রম নিয়োগ করে ইংলন্ডে ভারতের সম্পদ পাচার করার কাজে নিয়োজিত থেকেছে স্বদেশদখলকারীর দেওয়া উচ্ছিষ্ট চেটেপুটে খাওয়ার লোভে, এর চেয়ে নিকৃষ্ট জীবন আর কী হতে পারে ? এই জীবনে তো কোনও গৌরব দেখি না। অথচ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন কষককে ‘চাষাভুসা’ বলে হেয় প্রতিপন্ন করতে চান, তখন তিনি ভুলে যান যে, সরকারের তহবিল থেকে যে-বেতনটা তিনি পান, সেটা আসমান থেকে পড়ে না, সেটা মূলত কৃষক-শ্রমিকের ট্যাঁকের টাকার একটা অংশের সমষ্টি, রাষ্ট্রটাই চলে সে-টাকায় এবং তিনি একজন চাকর মাত্র। চাকরের এই ফাও প্রভুত্ব-গৌরবের কোনও নিহিতার্থ নেই। এই দেশের কোনও কৃষক তো ভুলে যান না যে, শিক্ষক তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে মানুষ করছেন, তিনি তো সম্মান করেন শিক্ষককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দারোগা কিংবা সচিব হলে কি সামাজিক সম্পর্কের উর্ধে উঠে মানুষ দেবতা হয়ে পড়েন ? এই হেয়ালি বোধগম্য নয়, এর অন্য ব্যখ্যা আছে। সেটা অর্থনীতি ও মনোবজ্ঞানের কথা। আপতত সে-প্রসঙ্গের অবতারণা করছি না। কেবল বলি, মেকলের শিক্ষাপদ্ধতির ছাঁচে ঢালাই হয়ে প্রকৃতপ্রস্তাবে তাঁরা বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত মানুষ।
মেকলের শিক্ষনীতির (যে-শিক্ষানীতি মিল্লাত হোসেনের ভাষ্যমতে ২০০ বছরের পরেও অটুট আছে) যথার্থ সার্থকতার প্রকৃষ্ট একটি উদাহরণ সর্বসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিল কয়েক বছর আগে বন্যাদুর্গত সুনামগঞ্জের আপৎকালে, এক ফাঁকে। জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেন মন্ত্রণালয়ের যে-সব সচিববর্গ, বন্যাদুর্গত সুনামগঞ্জ সম্পর্কে তাঁদের একজন পরমপণ্ডিতের অসম্ভব অদ্ভুত বিস্ময়কর, অবিমৃষ্যকর ও বিশ্ববিরল ভাষণ বিপন্ন সুনামগঞ্জকে সেদিন, এই যাকে বলে, একেবারে বিমূঢ়-হতবাক করে তোলেছিল। তিনি তাঁর তথাকথিত সুভাষণে যা বলেছিলেন, তার নিশ্চিত নির্গলিতার্থ ছিল এই যে, সুনামগঞ্জের অর্ধেক জনসংখ্যা কোনও দুর্যোগে মৃত্যুবরণ করলে পরে জেলাটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্গত বলে ঘোষণা করা যাবে, অন্যথায় নৈবচ। এটাই রাষ্ট্রনৈতিক বিধিবদ্ধ নিয়ম। তিনি দুর্গত মানুষের দাবিকে অসঙ্গত, অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন ও নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক প্রতিপন্ন করতে সুনামগঞ্জবাসীকে প্রকারান্তরে ‘অজ্ঞ, জ্ঞানহীন কিংবা মূর্খ’ বলতে দ্বিধাা করেন নি। অথচ তিনি উচ্চশিক্ষিত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কা কস্য পরিবেদনা! আমরা সুনামগঞ্জবাসী ড. মোহাম্মদ আলী খান, সাবিরুল ইসলাম বিপ্লব প্রমুখের মতো আমলা এই জেলায় পেয়েছি, কই তাঁরা তো এমন নন বা ছিলেন না।
এই সুবাদে শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা সম্পর্কে একটু ভাবনা করা যায় এবং এই রচনার পরিসরে এমনটি করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক কীছু হয়েছে বলে প্রতিপন্ন হবে না। অথবা প্রসঙ্গটিকে অনায়াসে অন্তত সুনামগঞ্জের সাধারণ মানুষের উপর একজন সচিবের তথাকথিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিরক্তি-বিরূপতার স্বরূপসন্ধানমূলক একটি সন্ধিৎসা বলেও ধরে নেওয়া যেতে পারে। ‘অনন্যা’ একটি পাক্ষিক পত্রিকা। তার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা এবং নালন্দা’। সেখানে বলা হয়েছে, “অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ তার রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের মতে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ। ব্যক্তির সকল শুভ সম্ভাবনার প্রকাশ, ব্যক্তির সাথে যেমন সমাজের তেমন মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক শিক্ষিত-অশিক্ষিতের বৈষম্যের ব্যবধান লোপ। আত্মিক ব্যবহারিকের মধ্যে সমন্বয়, সৌন্দর্য চেতনার কর্ষণ ও বিকাশ, কর্মে জ্ঞানের প্রয়োগ দিয়ে জীবনে সম্পন্নতা সমৃদ্ধি অর্জন, সৃজনশীলতার সাহায্যে মনুষ্যত্বের পরিচর্যা ও প্রসার।’ তার মূল বক্তব্য হলো রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার ওপর সব থেকে বেশি জোর দিয়েছেন।” (রাবেয়া বেবী, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা এবং নালন্দা, অনন্যা : ২৩ বর্ষ ১৪ সংখ্যা, ১৬-৩১ মে ২০১১, পৃষ্ঠা : ৩০।) অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ থেকে চয়িত রবীন্দ্রচিন্তার আলোকে উজ্বল এই বাক্য ক’টিতে শিক্ষিত মানুষের যে চারিত্র্যলক্ষণের দৃষ্টান্ত হাজির করা হলো তা কী সত্যিকার অর্থে আমাদের সব সচিবের আছে ? অন্তত উপরোক্ত যিনি, কোনও এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করার আগে সে-এলাকার অধের্ক জনসংখ্যার মৃত্যুর জন্যে নীতিগতভাবে অপেক্ষা করতে প্রস্তুত থাকবেন, তাঁর এই অপেক্ষার মধ্যে কি মনুষ্যত্বের পরিচয় মূর্ত হয়ে উঠে বা আছে ? প্রকারান্তরে তিনি কি নিজেকে খুনি করে তোলছেন না ? এবংবিধ প্রশ্নের উত্তরে অবশ্যই যে-কোনও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের নিরপেক্ষ উত্তর হেবে, “সকল সচিবের মধ্যে ‘সৃজনশীলতার সাহায্যে মনুষ্যত্বের পরিচর্যা ও প্রসার’-এর লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইনসচিব টমাস ব্যাবিংটন মেকলের কর্মকাণ্ডে মনুষত্বের পরিচয়বহ কোনও ‘সৃজনশীলতা’র ছিঁটেফোটাও যে ছিল না তার প্রমাণ তো একটাই, তিনি ভারতবর্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে পরম প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতি চালু করেন। কিন্তু সফল যে হতে পারেন নি, তার মূর্তিমান প্রমাণ হলো মেকলে শিক্ষানীতি প্রচলনের পরেও এই উপমহাদেশে কেবল বাঙালিদের মধ্যেই অনেক অনেক মেরুদ-ওয়ালা মানুষের জন্ম হয়েছে, যাঁদেরকে ইংরেজ প্রশাসন সন্ত্রাসীর পদক দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আর বর্তমানে দেখে শোনে মনে হচ্ছে দেশে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ চলছে এবং মনে হচ্ছে সেটা নতুন কীছু নয়, চিহ্নিত করার মতো কেবল নির্দিষ্ট কোনও নাম ছিল না, এখন একটা নাম দেওয়া হয়েছে। এই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’টা বোধ করি একটু কম বেশি রূপেরূপান্তরে সেই মেকলে মহোদয়ের কাল থেকেই ছিল। যাকে লোকে বলে ‘সিন্ডিকেট বাণিজ্য’ অর্থাৎ দলবেঁধে লুণ্ঠন।” এই যদি হয় উত্তর এবং তার মধ্যে সত্য নিহিত থাকে নয় বরং অনিবার্যভাবে আছে, তাহলে কোনও সচিব বা তাঁদের অধঃস্তনগণ এবং দেশের রাজনীতিবিদগণ কি এই বৃত্তের বাইরে অবস্থান নিতে বা করতে পারছেন ? মনে হয় না এবং এর বেশি এখানে বলার কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনি করি না। তবে বিশ্বাস করি, যে-মুহূর্তে এই বৃত্তের বাইরে তাঁরা দাঁড়াতে পারবেন, সে-মুহূর্তেই দেশ বদলে যেতে শুরু করবে, আর বদলটা হবে আত্মসাৎ অবসানের দিকে, লুণ্ঠনের নিবৃত্তির দিকে। কেবল বলি, ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ হলো, রাজনীতিবিদ ও পুঁজিপতিদের মধ্যে একটি আর্থরাজনীতিক আঁতাত বা উভয় পক্ষের স্বার্থোদ্ধার সংক্রান্ত একটি বন্দোবস্ত, যার মাধ্যমে পুঁজিপতিরা বৈধ ও অবৈধ উপায়ে সম্পদ আহরণ করেন, এবং রাজনীতিবিদরা সেটা অনুমোদন করেন। সোজা কথা দুর্নীতি। ভারতবর্ষে এই দুর্নীতিটা একদা ব্রিটিশরাও করেছে, তখনও ভারতের তথাকথিত শিক্ষিতরা ( ‘… a class of persons India in blood and colour but English in test, opinion and entellect.’) ব্রিটিশদের সে-অপকর্মের দোসর ছিলেন, ভারতের স্বদেশী আন্দোলনকে তারা ‘সন্ত্রাস’ বলে চালিয় দিয়ে আন্দোলনে নিরতদেরকে হত্যা পর্যন্ত করতে কসুর করেন নি, এই কছত্র আগে যাঁদেরকে মেরুদ-ওয়ালা বাঙালি বলে বিবিৃত করা হয়েছে।
প্রাকৃত সরকারের (সাধারণ মানুষই আসলে যে-কোনও দেশের আসল সরকার) প্রতি প্রত্যালীঢ়প্রপন্ন এমন একজনকে (যিনি কোনও এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করার আগে সে-এলাকার অধের্ক জনসংখ্যার মৃত্যুর জন্যে নীতিগতভাবে অপেক্ষা করতে প্রস্তুত থাকবেন) সর্বোচ্চ শিক্ষিত করে তোলার রসদ ও খাদ্য জোগাতে এদেশের কৃষক মাঠে ধান ফলাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছে বছরের পর বছর। এই ধরণের আমলাতান্ত্রিক মানসতা উপনিবেশের উপর আরোপিত ঔপনিবেশিকতার নির্মমতাকেই প্রকাশ করে। জন্মমূল কিংবা জীবনবাস্তবতা থেকে এমন বিচ্ছিন্নতা সত্যি তুলনারহিত। এমন নির্মমতারও উদাহরণ আছে। ১৯৭০ সালে তৎকালের পূর্বপাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে ঘুর্ণিঝড়ে দশলক্ষাধিক প্রাণহানির দুর্যোগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল পশ্চিমপাকিস্তানি সামরিক শাসকরা। মাওলনা ভাসানী এই উপেক্ষার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। এই নির্মমতাকে সা¤্রাজ্যবাদীদের পরিত্যক্ত বা প্রাক্তন উপনিবেশের চলিতকর্মের (অর্থাৎ প্রকৃতি ও সমাজ বদলে দেওয়ার কাজ) রন্ধ্রে রন্ধ্রে জায়মান রাখেন এইসব উক্ত সচিবের মতো মেকলেচেলারা। প্রশাসনে এই সব মেকলেচেলাদের নিজেদের রাজত্বের গৌরবকে প্রকটিতকরণ ও জায়মান রাখার স্বার্থেই ‘ডেপুটি কমিশনার’ শব্দজুটের প্রতি বেশি বেশি প্রীতিপ্রদর্শন অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়ে আসছিল এতোদিন এবং এই প্রশাসনিক প্রকরণসংস্কৃতি চর্চার ভেতরে জনবিচ্ছিন্নতার বীজটিও প্রচ্ছন্ন ছিল প্রশাসনিক কালবিস্তৃতির আগাগোড়া। তাই আবারও বলি, আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জায়মান পরিপ্রেক্ষিতে রীতিমতো উল্লম্ফন না হলেও একেবারে মামুলি কোনও ঘটনা নয়। কারণ ইতিবাচক পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটেছে, অন্তত মুখোশটার চুনসুরকি একটু একটু করে খসে পড়তে শুরু করেছে, মনে হচ্ছে মেকলেচেলাদের প্রভাব যৎকিঞ্চিৎ হলেও কমতির দিকে।
‘ডেপুটি কমিশনার’ নিয়ে বাতেলাটি একটু লম্বা হয়ে গেলো। তা হোক। সেটা আমার অনাকাক্সিক্ষত নয়, বোধ করি কীছু কীছু পাঠকেরও, যাঁদের জন্য এই লেখা ও লেখার জন্য কষ্ট স্বীকার।

(গ). অভিধানে ডুমুরের ফুল হয়ে যাওয়া শব্দসংক্রান্ত কথকতা
এবার ‘একাডেমি’ ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ প্রসঙ্গ। তখন ‘একাডেমি’ শব্দটি বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে / ী/ দিয়ে লেখা হতো এবং বাংলা একাডেমি প্রণীত অভিধানে ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ বাংলাভাষার এই যৎপরোনাস্তি জনপ্রিয় ও প্রথিত শব্দ দু’টি ভুক্তিবঞ্চিত ছিল, এখন অবশ্য জামিল চৌধুরী সম্পাদিত ও ২০১৬ সালের জুনে প্রকাশিত ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’-এ শব্দ দু’টিকে ভুক্তিভুক্ত করা হয়েছে। সেজন্য বাংলা একাডেমি ও অভিধান সম্পাদককে ধন্যবাদ।
‘গীতাঞ্জলি’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’ বাঙালির রাজনীতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, তারচেয়েও সহস্রগুণে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি যতো দিন পর্যন্ত অভিধানে ভুক্তিবঞ্চিত ছিল ততো দিন পর্যন্ত বাঙালি জনগোষ্ঠীকে স্বজাতিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার ঐতিহাসিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে বিবেচনা করা যায়। এটি একটি জাতিগত অবিমৃষ্যকারিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ইতিহাস সাক্ষী, তাঁকে হত্যা করে বাংলাদেশের বিকাশের স্বাভাবিক গতিকেই কেবল প্রতিহত করা হয়নি, এই দেশে নির্দিষ্ট একটা কালপর্বে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ও সে-রাষ্ট্রের জনগণকে বিচ্ছিন্নকরণের নোংরা রাজনীতি কার্যকর ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই। সর্বজনবিদিত যে : ঘরে বাইরে জাতির, দেশের কিংবা বাঙালি সংস্কৃতির শত্রুরা প্রকাশ্যে প্রবলাকারেই সক্রিয় ছিল। কেন জানি মনে হয়, অভিধান এরকম অবিমৃষ্যকর নোংরামির বাইরে ছিল না, সেখানেও রাজনীতি তার নোংরা নাক গলিয়েছে। এখানেই ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য। বিভীষণরা এখনও বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ করে না, এরা চিরায়ত মেকলেচেলা, জন্মজন্মান্তরের রাজাকার (আত্মসাৎ, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, প্রতারণা, অযৌক্তিকতা, অধর্ম, হিংসা, ঘৃণা, জিঘাংসা, রক্তপাত, রিরংসা, ধর্ষণ, বিশ্বাসঘাতকতার বিভীষিকার সমুচ্চয়ে সমুন্নত ও ঔপনিবেশিকতার ঐতিহাসিক দালাল পরিচিতি)। কারণ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে, “আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে অমি শোষণের যস্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্ব যুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিেিটড, দ্বিতীয় মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ১০১২, পৃষ্ঠা : ২৩৪)। তাই এইসব কুলাঙ্গাররা ভেবেছিল তিনি মার্ক্সের চেলা, বামপন্থীদের সতীর্থ। বস্তুত তিনি মার্ক্সের চেলা ছিলেন না, স্বীয় শুভবুদ্ধির জোরে যদিও কথা-বুলির ভাবভঙ্গিতে তিনি তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিকে সমাজতান্ত্রিক বোধবুদ্ধির সমানুপাতী করে তোলেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ গঠনে, স্বীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নে উপযুক্ত ভলশেভিক সুলভ কোনও রাজনীতিক দল তাঁর সঙ্গে ছিল না এবং সা¤্রাজ্যবাদ আয়োজিত তাঁর প্রস্থান পর্বের নাটক অচিরেই মঞ্চায়িত হলো। সে যা-ই হোক, তবে বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে, দেশ-জাতি অনিবার্য এক নতুন আর্থসামজিক ব্যবস্থার বিনির্মাণ ও তার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং ১৯৭৫-এর পর একটি খতরনাক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে দেশকে অতিক্রম করতে হয়েছে প্রতিনিয়ত উত্তরোত্তর বর্ধিতাকারে প্রবল দুবৃত্তায়িত দুঃশাসনের আগুনআঁচে দগ্ধ হতে হতে, যেখানে দেশ হয়ে উঠেছে একটি আত্মসাতের যজ্ঞভূমি।
বাংলাভাষায় ব্যবহৃত হয় কিন্তু পরিহারযোগ্য, অভিধানে বানানবিভ্রমগ্রস্ত কিংবা বাদপড়া (ভুক্তিবঞ্চিত) এমন শব্দ একটি দু’টি নয়, হাজার হাজার শব্দ আছে। এই বইয়ে এই রকম যৎসামান্য শব্দ/শব্দবন্ধ (প্রবসিত ইংরেজি ‘ডেপুটি কমিশনার’, বানানবিভ্রমগ্রস্ত ‘একাডেমী’, ভুক্তিবঞ্চিত ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ ইত্যাদির মতো শব্দ) সম্পর্কে তৎকালের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলে একান্ত প্রাতিস্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। কোথাও হয়তোবা কোনও বিশেষ স্থাপনার নামপাটার উল্লেখ করা হয়েছে অথচ এতোদিন পরে (বছর চারপাঁচেকের অধিক) হয়তো স্থাপনাটি অন্যকোনও নামপাটা কপোলকপালে ধারণ করে চারদিক আলোকিত করছে। এখন একজন সচেতন পাঠক পুস্তকের বর্ণনানুসারে সেটা মিলিয়ে পরখ করতে গেলে নির্ঘাত বিভ্রান্ত ও প্রতারিত হবেন। তাছাড়া ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর ২০০০ সালের পরিমার্জিত সংস্করণে ‘পরিমার্জিত’ শব্দটি ভুক্তিবঞ্চিত থেকে গেছে। অথচ আখ্যাপত্রে ফলাও করে লেখা হয়েছে ‘পরিমার্জিত সংস্করণ’। তৎকালের মহাপরিচালকের ‘পরিমার্জিত সংস্করণের প্রসঙ্গ-কথা’য় ‘পুনর্বিন্যস্ত’, ‘শীর্ষশব্দ’ দ্বয়ের ব্যবহার পরিলক্ষিত হলেও অভিধানের ভুক্তিতে তাদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় না, এমনকি শীর্ষশব্দ ‘পুন’-এর উপভুক্তিতে ‘পুনর্বিন্যাস’ও দুর্লক্ষ্য। অপরদিকে ২০১৬ সালের জামিল চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’-এ ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’সহ ‘পরিমার্জিত’ ও ‘পুনর্বিন্যাস’ সুলভ হলেও ‘পুনর্বিন্যস্ত’ ও ‘শীর্ষশব্দ’ এই উভয় শব্দই পূর্বেকার মতো ডুমুরের ফুল। এখন যাঁরা ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ ব্যবহার করবেন তাঁরা সঙ্গত কারণেই যৎকিঞ্চিৎ ধন্ধাক্রান্ত হতে পারেন। কারণ তাঁরা অধুনা বাজারজাতকৃত ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ ব্যবহার করবেন এবং অভিধানের পাতা উল্টালেই উত্থাপিত অনুযোগ তাঁদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই অসার প্রতিপন্ন হবে। তাঁরা ‘গীতাঞ্জলি’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘পরিমার্জিত’ ও ‘পুনর্বিন্যাস’ পেয়ে যাবেন। এমন ভজকট ঘটার কারণ, আমি আমার বক্তব্য পেশ করেছি ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ প্রকাশের বেশ ক’বছর আগে।
এই রকম (ডেপুটি কমিশনার, একাডেমী, গীতাঞ্জলি, বঙ্গবন্ধু, পরিমার্জিত ও পুনর্বিন্যাস ইত্যাদি সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক বিবেচনা) ধন্ধোদ্রেককারী বিষয়বস্তুর কমবেশি সন্নিবেশনের সমৃদ্ধি বা সমুন্নতি প্রকৃতপ্রস্তাবে এই বইটির অন্যতম দুর্বলতা। সেক্ষেত্রে রচনার তদানুসারে সংশোধন করা কর্তব্য ছিল, কিন্তু সে কর্তব্যকর্মটি লেখক কর্তৃত সচেতনভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। কারণ এইরূপ সংশোধন আর রচনার খোল নলচে পাল্টে ফেলা সমান কথা, যা প্রায় অসম্ভব। সুতরাং রচনার অঙ্গহানি পরিহার করার অনুরোধে সংশ্লিষ্ট অংশটুকুর শেষ পর্যন্ত যৎকিঞ্চিৎ পরিমার্জন করা গেলেও প্রসঙ্গের পরিবর্তন করা সম্ভব হয় নি। এই কারণে যাবতীয় সংশ্লিষ্ট বয়ার্ণনায় ০৪ এপ্রিল ২০১৪ তারিখের পূর্বেকার ভাষাসাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতই প্রকারান্তরে প্রাধ্যান্য পেয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের নামপাটার পরিবর্তন প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে বিবেচ্য। উদ্ধৃত প্রসঙ্গের যৎকিঞ্চিৎ পরিমার্জনা কারার সুযোগ যদিও ছিল কিন্তু প্রসঙ্গের পরিবর্তন করার কোনও সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ পরিবর্তিত প্রসঙ্গানুসারে পুনর্নির্মাণ সম্ভব হয় নি। সে-জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
দুই.
ক্রীতদাস প্রজননের আঁতুরঘর বেঘরপনার সংস্কৃতি
বিচ্ছিন্নতার কিংবা বিযুক্তির ( alienation ) প্রসঙ্গটি মনে এলেই ‘বোধ’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশের সেই প্রগাঢ়, গভীর, মর্মভেদী প্রশ্ন- ‘সকল লোকের মাঝে ব’সে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা?/ আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?’ (জীবনানন্দ দাশ, বোধ, ক্যাবকো, জুলাই ১৯৯৯, পৃষ্ঠা : ৫৮ ।)- মনের ভেতরে কেবল বর্ষায় টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের মতো রিমঝিম বাজতেই থাকে। জীবনানন্দীয় এই বিযুক্তির প্রপঞ্চকে (phenomena) একজন ‘সর্বমানবের হৃদয়ে সাড়া জাগানো এক অস্বস্তি, এক আকুতি, এক গভীর স্বস্থানবিচ্যুতি, বেঘরপনার (জার্মান ভাষায় উন্হাইম্লিখকাইট্) ভেতর থেকে বর্ণনা’ [অরিন্দম চক্রবর্তী, বসেছে পাগলের মেলা, দেশ (বই সংখ্যা) : ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ (বর্ষ ৮৫ সংখ্যা ৭), পৃষ্ঠা : ৯৯, স্তম্ভ : ২] বলে অভিহিত করেছেন। বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে, জায়মান আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের সাপেক্ষে তাঁর এই বর্ণনার সঙ্গে একাত্ম হতে একান্ত সঙ্গত ও বাস্তব কারণের কোনও অভাব ঘটে না এবং সহজেই হৃদয়ঙ্গম হয় যে, সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তিমানুষ পুঁজিবাদের প্রচণ্ড চাপেতাপে যুগপৎ অপরের ও নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে ক্রমাগত, অবিরাম এবং জীবনানন্দের ভাষ্যানুসারে সে-বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতাটা মানবের প্রাতিস্বিক মুদ্রাদোষ রূপে এখন প্রকটিত ও প্রতিপন্ন।
(চলবে)