বাংলাদেশে গ্রন্থাগার আন্দোলন

এস ডি সুব্রত
ডঃ: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন —–“জীবনে
তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। বই, বই এবং বই।”
প্রবাদ আছে …. যে জাতি ইতিহাস জানেনা সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। সামনে এগুতে হলে ইতিহাস জানতে হবে। আর সে ইতিহাস জানতে হলে বই পড়তে হবে। বই পড়তে হলে যেতে হবে গ্রন্থাগারে। কারণ অনন্য সব বই থরে থরে সাজানো থাকে গ্রন্থাগারে। যে জাতির গ্রন্থাগার যত উন্নত সে জাতি তত উন্নত। বই বা গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে জ্ঞান সাধকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদের সমৃদ্ধ করি, জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারি। অতীত জানতে, মানব সৃষ্টির ইতিহাস জানতে, মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ জানতে গ্রন্থ পাঠের বিকল্প নেই। গ্রন্থ পাঠের অবারিত দ্বার উন্মোচন করে দেয় গ্র্রন্থাগার। বাংলাদেশে গ্রন্থাগার উন্নয়নের সূচনা হয় প্রায় ২০০০ হাজার বছর পূর্বে। খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ময়নামতি ও মহাস্থানগড়সহ অন্যান্য বৌদ্ধ বিহারগুলোতে গ্রন্থাগারে অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন এর ভ্রমন বৃত্তান্ত থেকে বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। ১৮৫৪ সালকে বাংলাদেশে গ্রন্থাগার উন্নয়নের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮৫৪ সালে তিন জেলায় একযোগে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। সেগুলো হলো বগুড়া উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরী, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী ও বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী। ১৮৮৪ ও ১৮৮৫ সালে রাজশাহী ও কুমিল্লায় গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নোয়াখালী ও সিলেট পাবলিক লাইব্রেরী । পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয় এবং সেই সাথে গ্রন্থাগার সার্ভিস প্রবর্তন করা হয়।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য ও সাহিত্য সংস্কৃতির মূল্যবান উপাদান সংরক্ষণের জন্য ১৯৭২ সালের ৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর যা বর্তমানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনে অবস্থিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ৩০ শেখ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদ সভায় ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হয়। জনগণকে গ্রন্থাগার মুখী, মননশীল সমাজ গঠনের কেন্দ্রবিন্দু ও জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে লাইব্ররীর ভূমিকাকে দৃঢ় করার জন্য গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয়। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল বিধায় ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণা করা হয়। দেশে বর্তমানে সরকারি গ্রন্থাগার ৭১ টি এবং নিবন্ধিত বেসরকারি গ্রন্থাগার ৮০০টির অধিক। গ্রন্থাগার হচ্ছে সভ্যতার বাহন। সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রন্থাগারগুলো কে টিকিয়ে রাখতে হবে। প্রতিটি পরিবারে একটি করে গ্রন্থাগার থাকা জরুরি। যে পরিবারে গ্রন্থাগার থাকে সে পরিবারের কোন সদস্য জঙ্গিবাদ ও অসামাজিক কাজে জড়িত হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের এবং যুব সমাজ কে যদি আমরা বইয়ের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারি, জ্ঞানের রাজ্যে পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে তাদের আত্ম পরিশুদ্ধ হবে, তারা কোন ধরনের অপকর্মে জড়াবে না ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন —-“এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃংখলে বাধা পড়িয়া আছে। বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেয়া সেতু”। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম বলেন …….“একটি বই হচ্ছে একশটি স্কুলের সমান।” দেকারতে বলেন …….“ভাল বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সাথে কথা বলা”।
অস্কার ওয়াইল্ড বলেন ……..“একজন মানুষ ভবিষ্যতে কি হবে তা অন্য কিছু দিয়ে বুঝা না গেলেও তার পড়া বইয়ের ধরন দেখে তা অনেকাংশে বোঝা যায়।” রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেন …..“গ্রন্থাগার হল সভ্যতার দর্পণ। গ্রন্থাগার হচ্ছে অতীত ও বর্তমান শিক্ষা সংস্কৃতির সেতু বন্ধন।”
মাননীয় গ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন …..“গ্রন্থাগার হল জ্ঞানের ভান্ডার। মানুষকে আলোকিত করে তুলতে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম।” আসুন সবাই বই পড়ি, আলোকিত মানুষ হই। আলোকিত সমাজ তথা রাষ্ট্র গড়তে আলোকিত মানুষ লাগে। আর আলোকিত মানুষ হতে গ্রন্থ পাঠের বিকল্প নেই ।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।