আমি সব সময় নত সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে। সুনামগঞ্জের উপকরণ মূলধন নিয়েই আমি এগিয়ে গেছি- ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ। কথা সাহিত্যের অঙ্গনে পাঠক নন্দিত একটি নাম। একাধারে তিনি কথা সাহিত্যিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গীতিকার…। লিখছেন ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে। তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধ। প্রকৃৃতি ঘনিষ্ঠতা তাঁর রচনার অন্যতম দিক। শিশু মনস্তত্ত্বের স্বচ্ছ ও সাবলীল প্রকাশে বিভাময় তাঁর শিশু সাহিত্য। পাশাপাশি নবীন প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। অজানা জগতের অবগুন্ঠন খুলে বৈচিত্রময় করেছেন লেখার জগৎকে। বহু বিচিত্র জীবনধারা থেকে ঝিনুক দিয়ে তুলে আনেন মুক্তো কণা, যা পাঠকদের মোহবিষ্ট করে রাখে। তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতে (১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই) শ্রাবণের ঘোর বর্ষায় ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় গ্রামের জমিদার পরিবারে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পিতার প্রয়াত সুধাংশু শেখর রায় চৌধুরী এবং মাতা প্রয়াত নীলিমা চৌধুরী। ১৯৬১ সালে বিএ প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে হয়, স্বামীর নাম শৈলেন্দ্র শেখর দাশ পুরকায়স্থ’। সম্প্রতি এই লেখক সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। একুশে পদক প্রাপ্তি উপলক্ষে সুনামগঞ্জের সুসন্তান এই কৃতী লেখকের সাথে গত শুক্রবার কথা বলেছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর । ফোনালাপের মাধ্যমে তাঁর এই অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বার্তা সম্পাদক সজীব দে।
দৈ.সু.খ: প্রথমেই আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : ধন্যবাদ
দৈ.সু.খ: আপনার অনেক লেখায় সুনামগঞ্জকে পাওয়া যায়
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। আমার অনেক লেখায় সুনামগঞ্জের ছাপ আছে। সুনামগঞ্জের ছায়া বোধ আমার উপর আমৃত্যু থাকবে। এটা আমি কোন দিন ভুলতে পারবো না। সুনামগঞ্জের মতো এতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কোথাও নাই। আমি বিদেশেও গেছি কিন্তু সুনামগঞ্জের মতো এতো স্নিগ্ধ, শান্ত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরা শহর বোধ হয় আর কোথাও নাই। আমাদের গ্রামের বাড়ি সুখাইড়- সেখানকার বিল, হাওর, ধানক্ষেত, সবজি ক্ষেত, পুকুর, অবারিত আকাশ, বট, হিজল গাছের সারি আমাকে খুব টানতো। ঢাকার মতো তো না, যে বড় বড় ফ্লাটের কারণে আকাশ দেখা যায় না। এসব কথা আমি কিশোরদের একটা বইয়ে লিখেছি ‘মেঘের কাছে ইভুর চিঠি’। মানে ঢাকাতে ফ্ল্যাট বাড়িতে থেকে সুনামগঞ্জের মতো মেঘ দেখা যায় না, আকাশ দেখা যায় না। চিন্তামনি মাঠা-লক্ষ্মীবিলাস দই গয়ালরা নিয়ে যেতো সকাল বেলা। সে সময় মনে হয়েছে এর থেকে স্বাদু খাবার বুঝি পৃথিবীতে নেই।
দৈ.সু.খ: লেখালেখির শুরুটা কীভাবে- কবে?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : পড়তে খুবই ভালো লাগতো। বানান করে পড়া শেখার পর থেকে আমার বইয়ের প্রতি আকর্ষণ ছিলো। আমার এক ভাই মারা যাওয়ার পর আমার বাবা তার স্মৃতিতে একটি লাইব্রেরি দিয়েছিলেন। লাইব্রেরির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বিষাদ সিন্ধু– অনেক দুষ্প্রাপ্য বই ছিলো। বুঝে না বুঝে পড়তাম। ‘পথের পাঁচালী’ আমি অনেক ছোট বেলায় পড়েছি। পঞ্চম শ্রেণিতে যখন পড়ি তখন খাতার মধ্যে লিখতাম। কিছুটা মুখচোরা ছিলাম আমি। কারো মুখের উপর বলতে পারতাম না। তবে বাজে খাতা বা রাফ খাতায় লিখতাম ছড়া, গল্প, চাদনী রাত, কবিতা, মনের কথা। সে সময় ক্লাস ফাইভে পড়ি।
দৈ.সু.খ: প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় কবে?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : ক্লাস এইটে যখন পড়ি তখন দৈনিক সংবাদ পত্রিকার খেলাঘর পাতায় ‘বাদল দিনে’ নামে আমার প্রথম গল্প পত্রিকায় ছাপা হয়। তখন দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতা আর ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে লিখতাম। দেবী দি নামে একজন কচিকাঁচার আসরের সদস্য ছিলেন। আমার থেকে ২ বছরের সিনিয়র ছিলেন। আমি শুনেছি তিনি খুব পড়েন ও লিখেন।
দৈ.সু.খ: সেই সময়ে সুনামগঞ্জ শহর কেমন ছিলো?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : সেই সময়ে সুনামগঞ্জ শহরটা ছিল গ্রাম আবার শহরও। অর্থাৎ সেমি শহর। এজন্য সুখাইড় থেকে আসার পর মনে হয়নি নতুন জায়গায় এসেছি। পারিবারিক আবহাওয়া ছিলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে। সকলেরই ছিলো খুবই মিষ্টি স্বভাব।
দৈ.সু.খ: আপনার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে যদি বলতেন?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : গ্রামের পাঠশালাতে দু’বার ডবল প্রমোশন পেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে এসে ভর্তি হই সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই এসএসসি পাশ করি। এরপর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করলাম। ১৯৬১ সালে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় আমার বিয়ে হয়। স্বামীর কর্মস্থল রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে বি.এ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি।
দৈ.সু.খ: একমাত্র আপনি তো বাংলায় প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : না। না। সেবার কেউ প্রথম বিভাগ পায়নি। বাংলায় ২য় বিভাগে প্রথম হয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি পাশ করি। তবে ভাইবায় ফাস্ট ক্লাসের মার্ক পেয়েছিলাম। ড. আনিসুজ্জামান স্যার সহ আরও অনেকেই ভাইবা বোর্ডে ছিলেন। তখন অলরেডি আমার মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা ‘বন্দি দিন বন্দি রাত্রি’ সহ আরও একটি বই বেরিয়েছে। সেসময় বাংলার হেড অব দ্যা ডিপার্টমেন্ট (নামটা মনে পড়ছে না) বলেছিলেন, ‘ওর তো দুটো বই বেরিয়েছে।’ তখন একজন প্রফেসর বললেন, ‘তুমি কেন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে না।’ আসলে সেসময় তো এটা সম্ভব ছিলো না। সংসার ছিলো, সামজিকতা ছিলো। আমার তিন ছেলে মেয়ে তখন স্কুলে যাচ্ছে। তাই নাইটে ক্লাস করে পড়াশোনা শেষ করেছি।
দৈ.সু.খ: আপনার লেখায় মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলো কেমন ছিলো?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : ১৯৬৮-৬৯ দিকে আমার স্বামী এস. এস. দাশ পুরকায়স্থ পশ্চিম পাকিস্তানের এগ্রিকালচার ডেভল্যাপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তানের হেড অফিসে বদলি হন। আমরা গেলাম পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি। থাকতাম নাজিমাবাদ শহরে। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ছিলাম সেখানে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু পর শ্বশুর বাড়ির কিংবা বাবার বাড়ি কারো কোন খোঁজ পাইনি। ওরা কোথায় গেছেন তাও জানি না। তবে সেখানেও (করাচি) বম্বিং হতো রাতে। মাঝেমধ্যে দিনেও হতো। কাদা দিয়ে গাড়ি, জলের পাইপ ঢেকে রাখতে হতো। উপর থেকে বম্বিং করার সময় যেনো বুঝতে না পারে এটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া। একদিন বিকালে আমার স্বামী অফিস থেকে এসেছেন। উনাকে চা দিয়ে আমি চা খাচ্ছি এসময় আমাদের অপজিট বাসার একটি বিহারি ছেলে এসে বললো, ‘আন্টি ইস্ট পাকিস্তানমে জঙ শুরু হো গেয়া’। সেই সময় জানালার শার্সিতে কার্বন পেপার লাগিয়েছিলাম, রাতে আলো জ্বালানো যেতো না। সেখানে বাঙালি এবং হিন্দু একমাত্র আমরাই ছিলাম। থাকতাম এক পাঞ্জাবী বাসায়। ভদ্রমহিলা (শামিন ভাবী) ছিলেন পাঞ্জাবী আর ভদ্রলোক ছিলেন দিল্লীর মানুষ। মাইগ্রেট করে পাকিস্তানে এসেছেন। প্রথমে ভয় পেয়েছি। কিন্তু উনারা সাহস দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমাদের গায়ে এক বিন্দু রক্ত থাকতে তোমাদের ভাবী কেউ কিছু করতে পারবে না।’ ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। সেদিন শেষ বিকেলে রেডিও থেকে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার খবর শুনি।
দৈ.সু.খ: স্বাধীন বাংলাদেশে এলেন কবে?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : বাংলাদেশে আসার জন্য রওয়ানা হই ১৯৭৩ সালের মার্চের ১৮ তারিখে করাচির বাসা থেকে। আসতে দীর্ঘ এক মাস লেগেছে আমাদের। ১৯ এপ্রিল আমরা বাংলাদেশে আসি। ট্রেনে করে করাচি থেকে কোয়েটা, কোয়েটায় ৭ দিন ছিলাম হোটেলে। সেখান থেকে ল্যান্ডরোবার গাড়ি করে নোম্যন্সল্যান্ডে এসেছি। সেখানে এক সর্দারের বাড়িতে একরাত থাকতে হয়েছে। কান্দাহারে ১ দিন, কাবুলে ছিলাম ১৪ দিন, তারপর দিল্লী, কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে এসেছি। ‘মেঘ জ্যোৎস্নায় মুক্তিযুদ্ধ’ স্মৃতিকথা বইতে রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ভয়াল সেই উত্তাল দিন ও পরবর্তী সময়ের চিত্র। সেই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথামালা।
দৈ.সু.খ: একটি লেখায় পড়েছি- একটি জাতি কতটুকু উন্নত তা সেই দেশের শিল্প ও সাহিত্যের মধ্যে দিয়েও জানা যায়। দেশের বর্তমান সাহিত্য চর্চা সম্পর্কে কী মনে হয় আপনার ?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : আমার তো মনে হয় আমরা সব দিক দিয়েই সফল। অনেক কাজ হচ্ছে। যেমন কবিতায়, যেমন ছোটগল্পে, তেমন উপন্যাস, গবেষণায়। এক কথায় বলতে গেলে প্রচুর প্রাচুর্য্য রয়েছে আমাদের। কোন বিষয়ে পিছিয়ে নেই আমরা। তবে মনে হয় আর একটু দিন রাত্রির সময় যদি বেশি থাকতো, আমার বয়েস যদি কম থাকতো, তাহলে আমি অনেক পড়তে পারতাম, অনেক জানতে পারতাম। অনেক কিছুই তো জানি না।
দৈ.সু.খ: তখনকার অর্থাৎ আপনার ছোটবেলায় বিনোদন কী ছিল?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : আমার শৈশবটা ছিলো খুব সুন্দর। আমাদের সময়ে বিনোদন ছিলো একমাত্র বই। আমি যখন ছোট তখন বই পড়া নিয়ে কমপিটিশন হতো। লাইব্রেরির মেম্বার ছিলাম। স্কুল থেকে ইস্যু করে বই নিয়ে আসতাম। তবে সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীটা বদলাচ্ছে। আগে শোনতাম ওমুক জায়গায় ওমুক খুন হয়েছে। খেতে পারতাম না। আমার বন্ধুরাও এরকম ছিলো। মনে হতো বুকের ভেতরে হাহাকার করছে। তবে এখন তো এসব ভাবনার সময় নেই। স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবী এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীটাই হাতের মুঠোয়। এখনকার ছেলেমেয়েরা যতটুকু জানে বুঝে আমরা কি এতোটা জানতাম? জানতাম না। তবে সকলের মধ্যে মানবিক বোধ, মানবিক গুণাবলী থাকতে হবে।
দৈ.সু.খ: আপনার লেখালেখির প্রেরণা কে ছিলেন?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : আমার লেখালেখির প্রেরণা ছিলেন আমার বাবা। তিনি বলতেন, ‘পড়ার বইয়ের পাশাপাশি আউট বইও পড়তে হবে। না হলে তোমাদের জ্ঞান বাড়বে না।’ তবে বিয়ের পর থেকে আমার স্বামী (প্রয়াত এস. এস. দাশ পুরকায়স্থ) সব সময় আমার পাশে ছিলেন। আমি লিখতে না বসলে তিনি রাগারাগি করতেন। বলতেন, ‘ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমতা দিয়েছেন লেখার, তুমি কেন লিখছ না।’ এমনও হয়েছে ঈদের আগে বা কোন বিশেষ সংখ্যা লেখার সময় রাত ২টা পর্যন্ত আমি লিখেছি। তখন তিনি শীতের দিনে হালকা লিকারের চা করে দিতেন। আমার সাথে তিনিও রাত জাগতেন। এখন যখন আমি আলমারি খুলি তখন ভাবি, আমার কি এতো শক্তি আছে- এতোগুলো বই আমি কিভাবে লিখলাম। মনে হয় ঈশ্বরই বোধ হয় আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন। এটা ঈশ্বরের আশির্বাদ।
দৈ.সু.খ: নতুন প্রজন্মকে আপনার পরামর্শ বা উপদেশ-
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : নতুন প্রজন্মের জন্য যেটা আমিও নিজে ফিল করেছি তা হলো- পড়া, পড়া এবং পড়া। প্রচুর বই পড়তে হবে। তা ইংরেজি থেকে অনুবাদ হোক, উর্দু থেকে অনুবাদ হোক পড়তে হবে। অর্থাৎ জানতে হবে। পড়া থেকেই শেখা যায় কে কোন স্টাইলে লিখেছেন। কে কোন ভাবে পড়ছেন। কে কীভাবে বাক্য চয়ন করেছেন। পড়লেই এসব হৃদয়ঙ্গম করা যায়। সাহিত্য কেউ শেখাতে পারে না, নানান ধরনের বই পড়লে এটা বুঝা যাবে। নতুন প্রজন্মের কাছে সহমর্মিতাবোধেরও প্রত্যাশা করি।
দৈ.সু.খ: নিজের লেখা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ণ
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : অনেকেই বলেন, আমার লেখাটা তাদের নিজেদের মনে হয়। তারপরেও আমার লেখার ভূগোলটাকে সম্প্রসারিত করেছি। আমি সুনামগঞ্জের ধাঙরদের সাথে মিশেছি। আমাদের পাড়াতে (হাছননগরে) ওদের পূজা, হোলি খেলা দেখেছি, জীবনযাত্রা সম্পর্কে জেনেছি। ধাঙরদের উপর একটি গল্প সাহিত্য সাময়িকীতে পড়ে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ আমাদের বাসায় এসেছিলেন বলতে যে গল্পটা উনার ভালো লেগেছে। ৭৪ সনে গল্পটি বেরিয়েছিলো। বিষয়টি জেনে খুবই উৎসাহিত বোধ করেছি তখন আমি। এরকম অনেকের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি আমি। লাহোরের হীরামন্ডির এক বাঈজীর বাড়ীকে, তাদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ-বেদনা মূলধন করে উপন্যাস লিখেছি। ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে লিখেছি ‘আগুনের ঘর’। এবার বের হচ্ছে মহাভারতের উপর গবেষণাধর্মী একটি বই। নাম ‘আমি দ্রৌপদি’। আমি সব সময়ই চেষ্টা করি পাঠকদের নতুন ধরণের লেখা উপহার দিতে। ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কবির চৌধুরী সহ আরো অনেকে বলেন, ঝর্ণা নতুন নতুন অদেখা জগৎ পাঠকদের উপহার দিচ্ছে- যে জগৎ সম্পর্কে আমরা জানি না। অর্থাৎ নিজের সীমানাকে অতিক্রম করা, পরিচিত পরিধির বাইরে যাওয়া, নতুন রঙ দেয়া, পাঠককে ভাবনার খোরাক দেয়ার চেষ্টা করি আমার ক্ষমতা দিয়ে।
দৈ.সু.খ: অবসর সময়ে আপনি কী করতে ভালোবাসেন ?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : গান শুনতে ভীষণ ভালোবাসি। নিজেও গান করি। এখন অবশ্য কমে গেছে। কলেজের ফাংশনে গান করেছি। কলেজের ফাস্ট ইয়ারে কলেজের ইংরেজি টিচার এসে ক্লাসে আমাদের সবাইকে একে একে জিজ্ঞাসা করেছেন, তোমাদের এইম ইন লাইফ কী? তো যখন আমার পালা এলো বললাম, ‘আমি সংগীত শিল্পী হবো।’ আমিই এক সময় ভাবলাম দুইটা এক সঙ্গে চালাতে পারবো না। তখন লেখাটাকে করলাম জীবনের লক্ষ্য। আবার বৃষ্টিও ভালোবাসি খুব।
দৈ.সু.খ: পেছনের দিকে ফিরে তাকালে কী মনে হয় আপনার?
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : আমি অকৃতি অধম, তারপরও ঈশ্বর আমাকে অনেক দিয়েছেন। মানুষের ভালোবাসাও আমাকে দিয়েছেন যাতে পথ চলতে পারি। আমি সব সময় নত সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে। সুনামগঞ্জের উপকরণ মূলধন নিয়েই আমি এগিয়ে গেছি। আমি সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক দৃশ্যের কাছে নত। খাল, বিল, পুকুর, কচুরিপানা, ফুল (যেগুলি এখন আর দেখতে পাই না) সব কিছুর কাছে আমার আভূমি প্রণতি জানাই। তোমাদের ভালোবাসার কাছেও।
দৈ.সু.খ: মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ : তোমাকেও ধন্যবাদ, ভালো থেকো।