নাইকোর পরিত্যক্ত কূপে গ্যাসের মূল্য এখন সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার

সু.খবর ডেস্ক
ছাতকের টেংরাটিলায় কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর তত্ত্বাবধানে থাকা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটে ২০০৫ সালে। ক্ষতিপূরণ দাবির মামলায় ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জয় পায় বাংলাদেশ। ১৭ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এ গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্স।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, ছাতকে নাইকোর ফেলে যাওয়া কূপে ৪৪৭ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাসের মজুদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য হিসাব করলে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ১০ ডলার ধরে মজুদ থাকা গ্যাসের আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
ক্ষেত্রটিতে মজুদ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হলে তা গ্যাস সংকট মোকাবেলায় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে বর্তমানে গ্যাস সংকট মোকাবেলা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গ্যাস উত্তোলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পাওয়া গিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এখন এ গ্যাসক্ষেত্রে সিসমিক সার্ভে করবে বাপেক্স। এরপর শুরু হবে অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ।

দেশের বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে শুধু ছাতকেই মজুদ রয়েছে অর্ধট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যা দিয়ে অন্তত ছয় মাস সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব। সরবরাহের সঙ্গে তুলনা করলে এ গ্যাস দিয়ে ৮-১০ বছরের এলএনজির চাহিদা পূরণ সম্ভব।
২০০৩ সালে বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি চুক্তির আওতায় ছাতকের টেংরাটিলায় গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব পায় কানাডার প্রতিষ্ঠান নাইকো। কূপ খনন শুরু হলে ২০০৫ সালে গ্যাসক্ষেত্রটিতে দুই দফায় মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে। এ বিস্ফোরণের পর গাফিলতি ও অদক্ষতার কারণে নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ করা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২০ সালে এ মামলায় জয় পায় বাংলাদেশ। জয়ের পরই মূলত সেখানে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিকল্পনা শুরু করে বাপেক্স। নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রণালয় তাতে অনাপত্তি জানায়।
নাইকোর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ, কানাডা ও ব্রিটেনে বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (ইকসিড) নালিশ করে বাংলাদেশ। এসব মামলা ও অভিযোগের মধ্যে নাইকো ২০১০ সালে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণে দায়ী নয় বলে ইকসিডে একটি সালিশি মোকদ্দমা দায়ের করে। এরপর ২০১৬ সালে বাপেক্স আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে নাইকোর বিরুদ্ধে বাপেক্স ১১৮ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ সরকার ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের দাবি করে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে মামলায় জয় পায় বাংলাদেশ।
এ মামলায় বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ পাবে আশা করা হচ্ছে। এর বাইরে স্বাস্থ্যগত, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি নিরূপণ করে তার পরিমাণ আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে নাইকোর কাছ থেকে এ অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নাইকো দেউলিয়া হয়ে গেছে। বাংলাদেশে তাদের যে সম্পত্তি রয়েছে তা দিয়ে এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব।
মামলা জটিলতায় দীর্ঘ ১৭ বছর পর এখন নতুন করে গ্যাসক্ষেত্রটিতে অনুসন্ধান কূপ খনন করার পরিকল্পনা করেছে বাপেক্স। এ বিষয়ে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে শুরুতে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি হিসেবে বাপেক্স নাইকোর সঙ্গে কাজ করেছে। ফলে তারা চলে গেলেও এখন মামলার রায়ের ফলে আমরা সেখানে কাজ করতে পারব। ছাতকে পূর্ব ও পশ্চিম দুটি ব্লক রয়েছে। যে এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেনি, আমরা ওই এলাকায় থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করব। এরপর আমরা সেখানে অনুসন্ধান কূপ খনন করব।
তিনি জানান, ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে কাজ করার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) নিচ্ছে বাপেক্স। এ প্রস্তাব পাস হলে সেখানে কূপ খনন শুরু হবে।
জানা গেছে, গ্যাসের অনুসন্ধান ব্লক ৯-এ বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর সম্পত্তি রয়েছে। এ সম্পত্তির পরিমাণ গত কয়েক বছর আগের হিসাব অনুযায়ী ২৮০ মিলিয়ন ডলারের মতো। আর বাংলাদেশের কাছে নাইকো গ্যাসের বিল পাবে ৩০ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে তাদের সম্পত্তি রয়েছে ৩১০ মিলিয়ন ডলারের মতো।
দেশে এ মুহূর্তে যে গ্যাস সংকট রয়েছে তা মোকাবেলা করতে আরো আগেই ছাতক থেকে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া উচিত ছিল বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। মামলায় জয় পাওয়ার পরও দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়াকে অযথা সময়ক্ষেপণ বলে মনে করছেন তারা। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব জ্বালানি বিভাগকে এ গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, গ্যাস সংকট মোকাবেলায় এ মুহূর্তে ছাতক বড় সাফল্য দিতে পারে। সেখানে চার-পাঁচটি কূপ খনন করলেই গ্যাস পাওয়া সম্ভব। যদিও এ গ্যাসক্ষেত্রে খনন করার বিষয়ে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। সেসব মোকাবেলা করা গেলে এ ক্ষেত্রের মোট মজুদের মধ্যে অন্তত ৩৫০ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব, যা দেশের মোট গ্যাসের মজুদকে আরো সমৃদ্ধ করবে। তাই আরো আগেই এ সম্ভাবনা জ্বালানি বিভাগের কাজে লাগানো উচিত ছিল বলে আমি মনে করি।
জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঠিক রাখতে বাড়তি দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এ বছরই দেশে ৫৬ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার। এর বাইরে স্পট মার্কেট থেকে আরো ১৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করবে সংস্থাটি। ফলে এ খাত বাবদ সংস্থাটির ব্যয়ও বাড়ছে কয়েক গুণ। সব মিলিয়ে বর্তমানে গ্যাস খাতের মোট ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশই চলে যাচ্ছে এলএনজি আমদানিতে। এমন পরিস্থিতিতে ছাতক গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা গেলে এলএনজির আমদানি-নির্ভরতার অনেকটুকুই কাটিয়ে উঠতে পারবে বাংলাদেশ।
প্রসঙ্গত, সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় ১৯৫৯ সালে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এর এক বছর পর সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের পর ছাতক সিমেন্ট কারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়। ১৯৮৪ সালে এ গ্যাসক্ষেত্র সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় নেয়া হয়। ২০০১ সালে দুটি ভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র ছাতক (পূর্ব) ও টেংরাটিলা বা ছাতক (পশ্চিম) একীভূত করে একটি গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়।
সূত্র : বণিকবার্তা