উজ্জ্বল মেহেদী
‘বীর, বিদায় কিন্তু বলছি না!’ গত বছর এ দিনেই লিখেছিলাম এই শিরোনামে কিছু শোক-কথা। বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু অকস্মাৎ বিদায়ে সান্ত¦না খোঁজার চেষ্টা ছিল লেখায়। এক বছর পর কথা রাখার চেষ্টা, কাজটিতে হাত দিয়েছি মাত্র। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে আজকাল কোনো কিছু করতে গেলে সবার আগে ভার্চ্যুয়াল দিককে অগ্রাধিকার দিতে হয়। এই অগ্রাধিকারে পুরো এক রাতের চেষ্টায় তৈরি হলো ’বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু : বীরত্ব ভরা এক বীরের জীবন’ শীর্ষক তথ্যচিত্রের খসড়া। ব্যপ্তি ১২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।
আজ বৃহস্পতিবার, তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জে স্মারণসভায় প্রথম প্রদর্শনীর পর চূড়ান্ত হবে তথ্যচিত্রটি। ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ খসরু স্মৃতি পরিষদ’ ছাড়াও ব্যক্তিগত সহায়তা উদ্যোগটিকে অগ্রগামী করেছে। নিরিখ কমিউনিকেশনের নির্মাতা আব্দুল আলিম শাহ, ভিডিও এডিটর প্রভাত পাল সঙ্গী ছিলেন রাত-ভোর পর্যন্ত। গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করছেন বাবার মতো আইনকে পেশা হিসেবে নেওয়া খসরু ভাইয়ের মেয়ে সারাফ ফারহিন চৌধুরী দীয়া (ঢাকায় ড. কামাল হোসেন অ্যাসোসিয়েটসে রিসোর্স অ্যাসোয়িয়েট হিসেবে কর্মরত)। উদীচী সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম গত বছর নাগরিক শোকসভাকে সামনে রেখে তাঁর তৈরি করা তথ্যচিত্র থেকে ভিডিওচিত্র সংযুক্ত করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের আইনজীবী-সাংবাদিক খলিল রহমান, এ আর জুয়েল, ও সিলেটের ফটোসাংবাদিক মামুন হোসেইন কাজটির একটানা সঙ্গী।
‘মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র’ থেকে ‘বিপ্লবী বরুণ রায়’ থেকে ৪৭-এর দেশভাগ পরবর্তী রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যুক্ত হয়েছে। এ অংশটি কমরেড বরুণ রায়ের আমেরিকপ্রবাসী একমাত্র সন্তান সাগর রায়ের কাছ থেকে সংগৃহীত। আকাশ থেকে সুনামগঞ্জ ও দোয়ারাবাজারের ভিডিও সানন্দে দিয়েছেন চিত্রগ্রাহক পি পাল।
তথ্যচিত্রের শুরুটা একটি সকালের। খসরু ভাইয়ের জীবনের শেষভাগে অনন্য এক উদ্যোগকে তুলে ধরা হয়েছে। সেটা ‘সোনালী সকাল’। এরপর মুৃক্তিযোদ্ধা-অন্তঃপ্রাণ, হাওর আন্দোলনসহ জীবনের নানা দিক। এই সব বিষয় বিস্তারিত নয়, তবে দিক চিহ্নিত বলা চলে। একেকটি বিষয় নিয়ে বীরদর্পে কাজ করার সূত্রপাত আছে। ধারা বিবরণী হিসেবে ব্যবহার করা কথা গ্রন্থনা, এ রকম-
‘মাথার ওপর আকাশ। আমাদের একটা আকাশ ছিল। সেই আকাশের নিচে রাত কেটে ভোর হতো। একদিন, এক ভোরের আলোয় রচিত হয় একটি সকাল, সোনালী সকাল। সুস্থ জীবনের সন্ধানে তাঁরা পায়ে পায়ে পথ চলতেন। মন ভালো তো সব ভালো। একেকটা দিন গড়াত সুন্দর সকালের দিকে। দিন সুন্দর, আহা কী সুন্দর! মূলে ছিলেন একজন অনন্যজন, বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু।
বীরের জীবন! বহু প্রতিভার উষ্ণ প্রস্রবণের মতো ছিল। রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক ও নাগরিক আন্দোলনেরও সংগঠক ছিলেন। আমরা তাঁকে অকস্মাৎ হারিয়েছি ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। সুনামগঞ্জ শহরে সোনালী সকালে এখন তাঁর কোনো উপস্থিতি নেই, ছায়া নেই। তবে আছে মায়া। এখনো যাঁরা সকালেবেলা হাঁটেন, তাঁদের মননে-স্মরণে-প্রেরণা হয়ে আছেন একজন বজলুল মজিদ খসরু। তাঁর জন্ম ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে। পড়াশোনা করেছেন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রগতিশীল রাজনীতি সচেতনতা ছাত্রজীবন থেকেই। যুক্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে। সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তাঁর। জননী জন্মভূমি সুনামগঞ্জকে বুকে ধারণ করতেন বলেই প্রান্তিক এ জেলার সমস্যা-সম্ভাবনা, সমাজ-রাজনীতির বিবেকি বিশ্লেষক হিসেবে সুখ্যাতি ছিল তাঁর।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বয়স যখন ঊনিশ, ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন সেলা সাবসেক্টরে। সম্মুখ সমরে অংশ নেন ছাতক ও টেংরাটিলা যুদ্ধে। যুদ্ধ থেকে ফিরে পড়াশোনায় মন দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করে ১৯৭৮-এ আইনজীবী হয়ে সুনামগঞ্জ ফিরেন। তবে ওই বছরই তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি পাড়ি দেন। সেখানে পাঁচ বছর অবস্থান করে লিখেন ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’ পাঠকনন্দিত একটি ভ্রমণ গ্রন্থ। জার্মানি ছাড়াও আমেরিকা, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, চীন, সৌদিআরব, ভারত প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে সুনামগঞ্জে শুরু করেন আইনপেশা। সংসার জীবন শুরু ১৯৮৬ সালে। তাঁর স্ত্রী মুনমুন চৌধুরী একজন কবি ও সংগঠক। দুই ছেলে-মেয়ের জনক তিনি।
বজলুল মজিদ খসরু ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বে দৈনিক সংবাদ, স্বাধীনতার পর দৈনিক পূর্বদেশের সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা ছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলা ঘোষণার ঐতিহাসিক দিনে প্রকাশ হওয়া জেলার প্রথম সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক সুনাম’ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন।
২০১২ সালে তাঁর গবেষণাধর্মী বই ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ প্রকাশিত হলে মুক্তিযুদ্ধের অনেক হারানো আখ্যান প্রকাশ হয়। ‘একাত্তরের সুনামগঞ্জ’, ‘বরুণ রায় স্মরক গ্রন্থ’, ‘আলফাত উদ্দিন আহমদ স্মারক গ্রন্থ’ ও ‘হোসেন বখত স্মারক গ্রন্থ’ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গ্রন্থগুলো তাঁর হাতে গড়া মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র’র উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।
সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজারের ‘লক্ষ্মীপুর’ মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রাম হিসেবে সমাদৃত। সেখানে সাবসেক্টর কমান্ডার এ এস হেলাল উদ্দিন এবং নিজ নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু হাই স্কুল’। ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল শিক্ষা ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দেশে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রবর্তনের পূর্বে ক্যাপ্টেন হেলালের অর্থায়নে সুনামগঞ্জ থেকে দেশে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার প্রচলন করা হয়। সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রদান শুরু হলে এ কার্যক্রম বন্ধ করেন তাঁরা। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা অন্তঃপ্রাণ। আলোচিত বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবিকে অন্তরালমুক্ত করেছিলেন বজলুল মজিদ খসরু।
আইনপেশায় সফল এ বীর ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটরের। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী বহু সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যুক্ততা ছিল পৃষ্ঠপোষকতার। গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ নামক একটি সহায়তা ট্রাস্ট তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, সেক্টর কমান্ডারর্স ফোরাম, সুনামগঞ্জ মুক্তিসংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি, সুনামগঞ্জ রাইফেলস ক্লাব, আলফাত উদ্দিন রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন স্মৃতি ট্রাস্টসহ প্রভৃতি সংস্থা-সংগঠনের গোড়াপত্তনে ছিল তাঁর বলিষ্ট ভূমিকা। সর্বশেষ হাওর বাঁচাও আন্দোলন ছিল সুনামগঞ্জে অরাজনৈতিক নাগরিক আন্দোলনের বৃহত্তম একটি প্ল্যাটফর্ম।
অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, সাহসী, প্রতিবাদী ও মানবিক মানুষ হিসেবে সব মহলে পরিচিতি ছিল বজলুল মজিদ খসরুর। তাঁর সেই ঊনিশ বছরে মুক্তিযুদ্ধ থেকে জীবনের শেষ সময়ে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে অবহিত ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন।
একজন বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর জীবন ছিল বীরের মতো। বীরেরা বিদায় নেন না, জনমনে, ভাবনায় বেঁচে থাকেন। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে সুনামগঞ্জ পৌরসভা তাঁর স্মৃতিবাহী ষোলঘর পয়েন্টের একটি সড়কের নামকরণ করেছে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ খসরু সড়ক’ নামে। এই নামকরণ, প্রান্তজনে এইসব স্মরণ; তাঁর জীবন-অনুপম এক আদর্শ। আমাদের পথ দেখাবে, প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বীরত্ব ভরা এক বীরের জীবন।’


