ফসল রক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

বিশেষ প্রতিনিধি ও স্বপন কুমার বর্মন
হাওরগুলোর ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ নিয়ে এবারও জেলাজুরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাউবো বলছে ঠিকাদারদের কাজ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে এবং পিআইসির কাজ ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। কিন্তু হাওরপাড়ের বাসিন্দারা বলেছেন ‘কোথাও ৪০ থেকে ৫০ ভাগের বেশি কাজ হয়নি’। এ অবস্থায় ফসল রক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। অথচ গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে বরাদ্দ হয়েছে বেশি।
জেলার হাওরগুলোতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য গত কয়েক বছর ধরে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ হয়নি। এবার ৪০ টি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধে কাজ করার জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ায় বাঁধের কাজ করার জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা এবং ২৩০ টি প্রজেক্ট ইম্পিøমেন্টেশন কমিটি (পিআইসি)’র মাধ্যমে কাজ করার জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র দায়িত্বশীলরা জানান, এবার পিআইসি বিভিন্ন হাওরে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত আর ঠিকাদারেরা নতুন বাঁধ তৈরি ও বাঁধ উচুঁ করণের কাজ করার কথা। কাজের নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। পরে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, বাঁধের কাজ তদারকের জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও স্থানীয় পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যের জেলা কমিটি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সভাপতি করে নয় সদস্যের উপজেলা কমিটি রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্যকে সভাপতি করে করা হয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)। পাঁচ থেকে সাত সদস্যের প্রতিটি স্থানীয় পিআইসিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মনোনীত একজন নারী প্রতিনিধিসহ একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, একজন শিক্ষক ও একজন এনজিও প্রতিনিধি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মনোনীত একজন আনসার অথবা ভিডিপি সদস্য এবং পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিনিধি একজন কমিটিতে রয়েছেন। প্রতিটি পিআইসি সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকার কাজ করছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফুলপরী গ্রামের এলেমান হোসেন বলেন,‘বিশ্বম্ভরপুর থেকে জিরাকপুর পর্যন্ত করচার হাওর রক্ষা বাঁধের কোথাও ৪০ থেকে ৫০ ভাগের বেশি কাজ হয়নি। এখানে দুটি পিআইসি কাজ করছে, এতোদিন বাঁধে প্রায় দেড়’শ শ্রমিক কাজ করেছে, এখন (শনিবার থেকে) কমিয়ে ৩০-৩৫ জনকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, এই শ্রমিক দিয়ে বৃষ্টির আগে বাঁধের কাজ শেষ করা যাবে না এবং বৃষ্টি হলে মাটিও পাওয়া যাবে না’।
এই উপজেলার মুক্তিকলা গ্রামের কৃষক আব্দুল কবির বলেন,‘বিশ্বম্ভরপুর-জিরাকপুর বাঁধের কাজ কোনভাবেই বৃষ্টির আগে শেষ করা যাবে না’।
একই উপজেলার রাজনগর গ্রামের কৃষক যামিনি কান্ত সরকার বলেন,‘বিশ্বম্ভরপুর থেকে উমেদপুর হয়ে রাজনগর দক্ষিণ মাথা পর্যন্ত করচার হাওর রক্ষা বাঁধ গত বছরের চেয়ে এবার আরো খারাপ হয়েছে। নিয়ম রক্ষার কাজ হচ্ছে এই বাঁধে, ফসল রক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি আমরা’।
তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওর পাড়ের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘জামলাবাজ থেকে বড়দল বাগবাড়ী হয়ে কাউখালী পর্যন্ত মাটিয়ান হাওর রক্ষা বাঁধে স্তুপ স্তুপ করে কিছু দূর- দূর মাটি ফেলে রেখেছে, আগামী ১৫ দিনেও কাজ শেষ করতে পারবে না, আমরা এলাকাবাসী আজ (রবিবার) তাহিরপুরে এসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট এই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে গেছি’।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন,‘মাটিয়ান হাওরে কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে অভিযোগ পেয়ে আমি ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছি’।
কেবল বিশ্বম্ভরপুর বা তাহিরপুর উপজেলায় এমন অভিযোগ নয়, অন্যান্য উপজেলায় খোঁজ নিয়েও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিন অবশ্য বলেছেন,‘সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে ৮৪ টি বাঁধের কাজ এবার ঠিকাদারদের দিয়ে করানো হচ্ছে, এগুলোর কাজ ৫০ থেকে ৬০ ভাগ হয়ে গেছে। পিআইসিকে দিয়ে ১৩৫ টি বাঁধের কাজ করানো হচ্ছে, এগুলোর কাজ ৭০ ভাগ হয়ে গেছে। কাজের মান ঠিক রাখার জন্য আমরা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাঁধে বাঁধেই ঘুরছি’।