এক একর জমিতে গড়ে ৫০ মণ ধান উৎপাদন হলে ১৫ হাজার একরে উৎপাদিত ধানের পরিমাণ হয় সাড়ে সাত লাখ মণ। প্রতি মণ ১ হাজার টাকা হিসাবে এই পরিমাণ ধানের মূল্য ৭৫ কোটি টাকা। ঠিক এই পরিমাণ ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাহিরপুর উপজেলার কয়েকটি হাওরের কৃষকরা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় উপজেলার শনি, মাটিয়ান, মহালিয়া, জিনারিয়া, বাদেকানামুইয়া, বলদা, পানা, উলান, কলমা, নোয়াল, গলগলিয়া, সমসা-চুনখলা হাওরে জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার একর বোরো জমি চাষাবাদের বাইরে থেকে যাচ্ছে। গত ১০/১২ বছর ধরে জলাবদ্ধতার কারণে এইসব জমিতে চাষাবাদ বন্ধ রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস ৫ হাজার একর জমি অনাবাদী থাকার কথা বললেও স্থানীয় কৃষকদের দাবি অনাবাদী পড়ে থাকা জমির পরিমাণ এর চাইতে তিন গুণ বেশি। অপরিকল্পিত স্লুইস গেট নির্মাণ, হাওরের পানি নিষ্কাষণের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া, নদীর নাব্যতা হ্রাস প্রভৃতি কারণে এই স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বছর বছর বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদী রেখে দেয়া কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। অন্যদিকে জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত জমির মালিকরা দিশেহারা অবস্থায় দিন পার করছেন।
সরকার কোন কৃষি জমিকে অনাবাদী না রাখার জন্য নানা ধরনের কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের বিঘোষিত নীতি হলোÑ সমস্ত অনাবাদী জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসা। এজন্য সর্বত্র অনাবাদী জমির পরিমাণ ও তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বস্তুত সরকারি প্রচেষ্টায় কী পরিমাণ অনাবাদী জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে তা জানা যায় না। বলা যেতে পারে এক্ষেত্রে সফলতার হার এখনও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ খাদ্য চাহিদার জায়গায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের এক ধরনের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন গোচরীভূত নয়। বরং চালের বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে এমন দাবির পক্ষে কোন আলামত দেখা যায় না। বাজার ভর্তি থাকে ভারতীয় চালে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হলে প্রতি বছর কেন এত বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করতে হবে? দেশে উৎপাদিত ধান বা চাল বিদেশে রপ্তানি হয় এমন তথ্যও জানা নেই। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদার জায়গায় উৎপাদন বাড়ানোর যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই অনাবাদী জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনা একটি জরুরি জাতীয় কর্তব্য।
শুধুৃ তাহিরপুর নয় দেশের সর্বত্রই বিপুল পরিমাণ অনাবাদী জমি রয়েছে। সরকার পরিকল্পনামাফিক কাজ করলে এসব জমিকে চাষের আওতায় আনা সম্ভব। বিশেষ করে জলাবদ্ধতার সমস্যাটি সমাধান করা গেলে একটি বড় পরিমাণ অনাবাদী জমি চাষের আওতায় অনায়াসে নিয়ে আসা যেতে পারে। সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে হাত দিতে হবে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে আমরা দেখতে পাই। হাওরে বোরো ফসল রক্ষার জন্য বছর বছর যে বেড়ি বাঁধ দেয়া হয় এগুলো হাওর-নদীর নাব্যতা নষ্ট করে স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন। হাওরের ফসলকে অবাঞ্ছিত বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে অস্থায়ী বেড়িবাঁধের চিন্তা থেকে সরে এসে স্থায়ী সমাধানের চিন্তা করতে হবে।
তাহিরপুরের যে ১৫ হাজার একর জমিতে ধান উৎপাদন করা যায় না, সেই জমিকে কীভাবে চাষাবাদের আওতায় আনা যায় তার সুষ্ঠু ও কার্যকর স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য আমরা কৃষিবিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এক্ষেত্রে পানি-বিশেষজ্ঞ, নদী-বিশেষজ্ঞ, হাওর-বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

