বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত শাল্লা উপজেলার বেপরোয়া মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের এতো ক্ষমতা! প্রায় আড়াই বছর ধরে অফিস না করেই বেতন নিচ্ছেন তিনি। নোয়াখালি জেলার বাসিন্দা এই কর্মকর্তা যেন আইনের উর্ধ্বেই থাকবেন। শিক্ষা বিভাগও অসহায় তার কাছে।
জানা যায়, তার (আজিজুর রহমানের) কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি উপজেলা পরিষদের সাধারণ সভায় আলোচনার পর ২০২০ সালের ৪ মার্চ চিঠি দিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এরপর জেলা শিক্ষা অফিসার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক, মহাপরিচালকে দফায় দফায় চিঠি দিয়েও কোন লাভ হয় নি। এক পর্যায়ে জেলা প্রশাসক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হয় নি। উল্টো জেলা শিক্ষা অফিসারকে দেখে নেবার হুমকি দিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। এই বিষয়েও থানায় জিডি হয়েছে। তাতেও সংশোধিত হন নি, বা কর্তৃপক্ষও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় নি। তিনি যথারীতি বেতন পাচ্ছেন, বহাল তবিয়তে নিজ বাড়িতেই আছেন।
শাল্লা উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দায়িত্বশীলরা জানান, নোয়াখালি জেলার বাসিন্দা আজিজুর রহমান রাজধানী ঢাকায় বসবাস করেন। ২০১৯ সালের ২৪ জুন শাল্লা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন তিনি।
শুরুতে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসে কেবল উপস্থিত থাকতেন। কিছুদিন পর সেটিও ছেড়ে দেন। ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলা পরিষদের সাধারণ সভায় প্রথম তার বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ ওঠে।
পরে ওই বছরের ৪ মার্চ শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল-মুক্তাদির হোসেন উপজেলা পরিষদের কার্যবিবরণিসহ ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট চিঠি পাঠান।
২০২০ সালের ৩ মার্চ জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলম মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট তার অনুপস্থিতির কথা জানিয়ে চিঠি লিখেন। তাকে বদলীসহ বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।
জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম গত বছরের ২৭ অক্টোবর আবারও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার আঞ্চলিক উপপরিচালক বরাবরে এই কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কথা জানিয়ে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি শাল্লার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চিঠির উধৃতি দেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকায় তার অনুপস্থিতির বিষয়ে ছাপা হওয়া প্রতিবেদন যুক্ত করে দেন তিনি। তার অনুপস্থিতে জাতীয় বিভিন্ন দিবসের কার্যক্রমসহ কি কি কাজে বিঘœ সৃষ্টি হয় তাও চিঠিতে উল্লেখ ছিল। ওই সময়ে শাল্লায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য সফর সফল করা নিয়ে কয়েকদফা বৈঠকেও তার অনুপস্থিতির কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কোনভাবেই এই কর্মকর্তাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যায় নি।
জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম বললেন, এই বিষয়টি সকলেরই জানা। আমি দুই দফা চিঠি দিয়েছি। আমাকে হুমকি ধমকিও খেতে হয়েছে। আপনি উর্ধ্বতনদের জিজ্ঞেস করে তথ্য নিতে পারেন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এই কর্মকর্তার অনুপস্থিত থাকার অভিযোগের বিষয়টি একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করান।
তদন্ত প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুর রহমান কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে হাজিরা খাতায় দেড় বছর হয় স্বাক্ষর প্রদান করছেন। অফিস চলাকালীন সময়ে তার অফিস তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। উপজেলা পরিষদের সাধারণ সভায় যোগদান করেন না তিনি। কালেভদ্রে শাল্লায় আসলেও জেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে অবস্থান করেন।
পরে ১৭ পাতার এই তদন্ত প্রতিবেদনসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিবের নিকট পত্র পাঠান সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। কিন্তু কোন কিছুতেই কোন কাজ হয় নি। উল্টো সুনামগঞ্জের শিক্ষা অফিসারকে মোবাইলে হুমকি দেন আজিজুর রহমান। শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম কিভাবে চাকুরি করেন, হুমকি দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন তিনি। পরে তার মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করে সুনামগঞ্জ সদর থানায় জিডিও করেছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা আজিজুর রহমানের দুটি মুঠোফোন নম্বরের একটিতে বহুবার চেষ্টা করে বন্ধ পাওয়া যায়। আরেকটিতে (০১৭০১৭০০০০০) বুধবার রাত সাড়ে ৮ টায় তাঁর বক্তব্য জানার জন্য ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেন। সালাম দিয়ে তাঁর কাছে এই প্রতিবেদক জানতে চান, ভাই স্থানীয় মাধ্যমিক শিক্ষকগণ, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকসহ সকল কর্তৃপক্ষই বলছেন, আপনি অনুপস্থিত থাকছেন। বেতনও নিচ্ছেন। তিনি জানতে চান, কে বলছেন আপনি, পরিচয় দিতেই- ফোন কেটে দেন আজিজুর রহমান। এরপর তিনটি মুঠোফোন থেকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি আর রিসিভ করেন নি।
শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বললেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বছরের পর বছর ধরে অনুপস্থিত থাকা, শিক্ষক কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করাসহ তার অদায়িত্বশীলতা নিয়ে সমকালসহ একাধিক দৈনিকে বিভিন্ন সময় সংবাদ ছাপা হয়েছে। কিন্তু কিছুই হয় নি আজিজুর রহমানের। বরঞ্চ তিনি সাংবাদিকদের নিয়ে উপহাস করেন।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বললেন, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের মামলা করা যায়। দুর্নীতি দমন আইনের পর্যায়ভুক্ত অপরাধী তিনি।
সুনামগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, শাল্লা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার এমন আচরণের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জানাবো আমি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে, তার চাকুরি থাকার কথা নয়। তিনি ইতিপূর্বে সরকারি যে অর্থ নিয়েছেন তাও ফেরৎ দিতে হবে। কেউ যদি দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেন, তাতেও তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হবেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিলেট অঞ্চলের পরিচালক আব্দুল মান্নান বললেন, এই কর্মকর্তার এধরণের আচরণের বিষয়টি আমরাও জানি। দুই মাস আগে মহাপরিচালক বরাবরে আমিও চিঠি দিয়ে তার বিষয়ে জানিয়েছি। এখনো এই বিষয়ে আমি কোন চিঠি পাই নি। আশা করি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


