আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
বৈরী আবহাওয়া প্রচন্ড খরা ও ভেজাল কীটনাশক ব্যবহারে তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরের পূর্ব পাড়ের জমিগুলোর ব্রি-২৮ ধানের আশানুরূপ ফলন না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে মাটিয়ান হাওরের জামলাবাজ গ্রাম ও বড়দল গ্রামের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বোর ধান রোপনের পর থেকেই পশ্চিমা ঠান্ডা বাতাস ও খরায় ব্রি—২৮ ধানের ব্যপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
মাটিয়ান হাওর পূর্বপাড়ের গ্রাম জামলাবাজ। এ গ্রামের কৃষক মুকসেদ আলী বলেন, তিনি মাটিয়ান হাওরে ৬ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমিতে ব্রি—২৮ ধান রোপন করেছিলেন। ভেজাল কীটনাশক, প্রখর রোদ ও খরার কারণে তিনি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি আরো জানান, জমিতে আগাছা পরিস্কার করার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করেছিলেন। তাতে কোন কাজই হয়নি। জমিতে ধানের চেয়ে আগাছার পরিমাণই বেশি। তিনি অনেকটা বাধ্য হয়েই তার জমির ধান গাছ কেটে ঘাস হিসাবে তার গৃহপালিত গরুকে খাওয়াচ্ছেন।
৬ কিয়ার জমি রোপন করতে গিয়ে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কত টাকার ধান বিক্রি করতে পারবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মুকসেদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, আত্মীয় স্বজন ও অন্যের কাছ থেকে ধার দেনা করে জমিগুলো রোপন করতে হয়েছে। এতে তার ব্যয় হয়েছে ৩৮ হাজার টাকা। বর্তমানে ধানের জমি কাটতে গেলে লাভের আশা দূরের কথা, শ্রমিকের মজুরী দেয়াই কষ্টকর হবে। এমতাবস্থায় তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন, সদস্যরা বলেছেন এ অবস্থায় ধান কেটে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লাভ নেই। যেটুকু লোকসান হয়েছে এ পর্যন্তই থাক।
শুধু মুকশেদ আলীই নয়। মাটিয়ান হাওরপাড় রতনশ্রী, বড়দল, কাউকান্দি, কামাড়কান্দি. গোলকপুর সহ সকল কৃষকেরই ব্রি—২৮ ধানের ফলন বিপর্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষকরা বলছেন মাস দেড়েক আগে (ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে) হঠাৎ করে হাওরে রোপনকৃত জমির ধান গাছ হলুদ হয়ে যায়। হলুদ হওয়ার পর অনেক কৃষক জমিতে সালফার ও ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন। এখন আবার ধান গাছরে পাতা বিবর্ণরূপ ধারণ করেছে।
অনেক জমিতে দেখা যায় ধান গাছ আছে ঠিকই কিন্তু ধান নেই, শুধু পাতা পড়ে আছে। অনেক জমিতে ধানের শীষ বের হলেও শীষে পুষ্ঠি নেই। যা বের হচ্ছে তার অধিকাংশই চিটা।

ভাটি জামালগড় গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে ধানের হলুদ বর্ণ দেখে অনেক কৃষক জমিতে প্রচুর পরিমাণে সেচ, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। কিন্তু তারপরও কৃষক তেমন সুবিধা পাচ্ছেন না। বরং অতিরিক্ত ইউরিয়া দেয়ার কারণে জমিতে প্রচুর ঘাস জন্মাচ্ছে ।
মধ্য তাহিরপুর খলাহাটি গ্রামের কৃষক সত্য রঞ্জন রায় বলেন, মাটিয়ান হাওরে তারাজান বিলের পশ্চিম পাশে তিনি ৩ কেয়ার জমিতে ব্রি—২৮ ধান রোপন করেন। মাস দেড়েক পূর্বে হঠাৎ তার ধান হলুদ হয়ে যায়। সে সময় তিনি উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে সালফার সহ বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেন। সেই সাথে একাধিকবার তিনি বিল থেকে জমিতে সেচ দেন। কিন্তু সেচ দেয়ার পরও জমিতে আশানুরূপ ফলন দেখতে পান না তিনি।
তবে মাটিয়ান হাওরে ব্রি—২৮ ধানে সমস্যা হলেও ব্রি ২৯ ধানে এখনো কোন সমস্যা দেখা যায় নি বা এ সংক্রান্ত্র কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি হাওর পারের কৃষকদের কাছ থেকে।
মাটিয়ান হাওরপার বড়দল গ্রামের কৃষক আতিক আহমদ বলেন, অনেক কৃষক নিয়মিত জমিতে সার,সেচ ও কীটনাশক দিয়েছেন। তাদের জমিরও একই অবস্থা। তিনি মনে করেন নিম্নমানের বীজের কারণেও ২৮ ধানের ফলনে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসান—উদ—দৌলা বলেন, মাটিয়ান হাওরের পূর্ব পাশে ব্রি—২৮ ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এ রকম খবর কৃষকরা তাকে জানিয়েছেন। তারপর তিনি সরেজমিন হাওরে গিয়েছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন খরার কারণে ব্রি—২৮ ধানের ফলন কিছুটা কম হতে পারে। সময়মত সেচ দিলে সমস্যা তেমন হতো না বলেও তিনি জানান।


