অবশেষে সাধারণ মানুষের আশংকাই সত্য প্রমাণিত হতে চলেছে। প্রকৃতির সাদামাটা চোখ রাঙানিতেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়া শুরু করল এক বছরে শত কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলো। সামান্য প্রতিরোধ রচনা করতে পারল না এই তথাকথিত দুর্বল বাঁধ। ২০১৭ সনের পর আবারও প্রমাণিত হলÑ সরকারি টাকা খরচ করে যে বাঁধ নির্মাণ করা হয় তা দিয়ে ঠিকাদার, পিআইসি, আমলা-প্রকৌশলীদের ‘লোভের হাওর’ সুরক্ষিত থাকলেও কৃষকের হাওর তাতে রক্ষা হয় না। এই বাঁধ দিলে যা না দিলেও তা। যে বছরগুলোতে বোরো ফসলের পানিডুবি ঘটে না তা প্রকৃতির বদান্যতার কারণেই। সময়ের এক ফোড় অসময়ের দশ ফোড়ের সমান বলে কথা। যখন উজানে বর্ষণ হচ্ছে তখন বাঁধে বাঁধে দৌঁড়ে তেমন কোন লাভ হয় না। অথচ বাঁধের কাজ শুরুর দিন থেকেই বারবার কাজের মান বজায় রাখার তাগিদ ক্রমাগতভাবে দেয়া হচ্ছিল পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। বছরজুড়েই হাওর-ভাবনায় সজাগ থাকেন হাওরপাড়ের মানুষরা। সেই সজাগ চেতনা থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় গবেষণাপূর্বক লাগসই প্রযুক্তি ও পদ্ধতি উদ্ভাবনের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। শুধু সনাতনী বাঁধ যে উজানের পানির ঢল রুখতে পারবে না তাও বলা হচ্ছিল। এজন্য নদী খনন করার উপর সমধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। উজানের পানি ধারণ করা ও দ্রুত সমুদ্রে নিয়ে যাওয়ার মত যথেষ্ট জায়গা ভাটিতে থাকতে হবে। নতুবা এই পানি ফসলের খেতে ঢুকবেই। সরকার নদী খননের কাজও শুরু করেছেন। তবে সেটি বাঁধ নির্মাণের চাইতেও ভয়ানক দুর্নীতিগ্রস্ত। বাঁধের বিষয়ে তো কিছু জানা যায়, নদী খননের বিন্দুবিসর্গও কেউ জানতে পারেন না। এই খননের ফলে কোথাও নদীর নাব্যতা বেড়েছে সে কথা কেউ বলতে পারবেন না।
হাওরে উড়ালসেতুসহ যোগাযোগ রাস্তা নির্মাণের একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে আমরা জানি। এই প্রকল্পের আওতায় হাওরচিত্র আমূল বদলে যাবে বলে আমাদের ধারণা দেয়া হচ্ছে। যেকোন উন্নয়ন প্রকল্পকেই আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু উন্নয়নের বিনিময়ে আমরা নিজেদের সম্পদ বিসর্জন দিতে রাজী নই। হাওরের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধান ও মাছ উৎপাদন করা। এই উৎপাদক বৈশিষ্ট্যকে ক্ষুণœ করে আর কোন উন্নয়ন আমরা চাই না। আমরা চাই যাবতীয় উন্নয়নের লক্ষ্য হবে হাওরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য। হাওরের উড়াল সেতু যদি এই বৈশিষ্ট্যের সাথে অসংগতিপূর্ণ হয় তাহলে ওই ‘মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের পানিবিজ্ঞানী, মৎস্যবিজ্ঞানী, কৃষিবিজ্ঞানী বা হাওর বিশেষজ্ঞের ঘাটতি নেই। তাঁদের সুসমন্বয়ে হাওর রক্ষার স্থায়ী বিজ্ঞানসম্মত পথ অনুসন্ধান করতে হবে। মানুষ ইচ্ছা করলে কোন কিছুই অজেয় নয়। খর¯্রােতা হোয়াংহু যদি নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, বিশাল পদ্মা যদি বশ্যতা স্বীকার করতে পারে তাহলে হাওরও সভ্য মানুষের সঠিক ভাবনা আর ঐকান্তিক কাজে সাড়া দিবে। মানুষ প্রকৃতিকে নিজের পক্ষে নিয়েই টিকে আছে, এই পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে।
হাওরের পাড়ে পাড়ে এখন ফসলহারা কৃষকদের কান্না। এই কান্নার ওজন মাপার কোন দাঁড়িপাল্লা নেই। এ কেবল অনুভবের। এই কৃষকরা সারা বছর কীভাবে চলবেন সেই দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। যে হাওরগুলো এখনও ডুবেনি (আশার কথা হলÑ এখনও বেশির ভাগ হাওর ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও রক্ষিত আছে, এবং নদীর পানি ধীর গতিতে হলেও কমার সংবাদ রয়েছে) সেগুলোর কৃষকরাও সার্বক্ষনিক উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন। কৃষকরা নিজ দায়িত্বে বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত আছেন দিন-রাত্রি। লড়াইয়ে নিয়োজিত সংগ্রামী কৃষকরা নিজেদের ফলানো ফসল রক্ষা করতে সক্ষম হোন এই আমাদের একান্ত কামনা।

