ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
আস্তমা গ্রামের দরিদ্র বর্গাচাষী আবদুস শহিদ। দেখার হাওরের মাঝখানে চাষ করেছেন তিন হাল জমি। ৩৫ মন ধান দিবেন বলে প্রায় ৩ মাস আগে টাকা এনেছেন একজনের কাছ থেকে। আরেক দাদনদারের কাছ থেকে এনেছেন ৩০ হাজার টাকা। সুদ সমেত এসব টাকা ফেরত দিতে হবে ধান ঘরে তুলে। এসব কোনো ব্যাপারই ছিলো না তাঁর জন্যে। ধান সঠিকভাবে উঠলে ঋণ তিনি পরিশোধ করতে পারবেন অনায়াসেই। এখন তাঁর মনে প্রচ- শঙ্কা কাজ করছে। কারণ মহাসিং নদীতে প্রবল বেগে পানি বাড়ছে। নদীটির উথারিয়ার বাঁধ সীমানার দুই তিন হাত নিচে টলমল করছে পানি। আসামপুর সংলগ্ন দিকদাইড় বাঁধের মূল ক্লোজারে সোমবার দিবাগত রাত ফাটল দেখা দিয়েছিলো। আসামপুর-আস্তমা গ্রামবাসীর রাতভর চেষ্টায় রক্ষা পায়। আহসানমারা সেতুর নিচে বাঁধেরও একই অবস্থা। যে কোনো এক দিকে যদি হাওরে পানি ঢুকে পড়ে তাহলে এক রাতেই তলিয়ে যেতে পারে সুনামগঞ্জের শস্যভা-ার খ্যাত শতকোটি টাকার ধান গর্ভে ধারণ করা দেখার হাওরটি। যদি এমনটা ঘটে তাহলে স্ত্রী আর ৪ সন্তান নিয়ে দেশান্তরি হতে হবে এই বর্গাচাষীকে।
এ তো শুধু দেখার হাওরের একজন কৃষকের বর্তমান দৃশ্য। একই কারণে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষকরা শঙ্কিত। মহাসিং নদীসহ ছোট ছোট আরও অসংখ্য নদী পাহাড়ি ঢলে ইতোমধ্যে জলগর্ভা। নদীতে ধারণ ক্ষমতার বেশি পানি থাকায় প্রতিটি নদীই ফুলে ফেঁপে উঠছে। এতে পানির প্রবল ধাক্কা পড়ছে ফসল রক্ষা বাঁধের উপর। ফলে নদীর পাড় কেন্দ্রিক যেসব বাঁধ রয়েছে বিপজ্জনক অবস্থানে। যে কোনো সময় ফাঁটল দেখা দিয়ে ভেঙে যেতে পারে ফসল রক্ষা বাঁধ। ইতোমধ্যে আহসানমারা সেতুর নিচের বাঁধ ও মহাসিং নদীতে জয়কলস ইউনিয়নের আসামপুর সংলগ্ন দিকদাইড় বাঁধে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। যদিও রাতেই কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধে কাজ করে বাঁধ দুটিকে এ যাত্রায় টিকিয়ে রেখেছেন। ফাঁটল দেখা দিয়েছে মাছুখালীর বাঁধ ও দরগাপাশার জামখলার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধেও। কৃষকরা দিনরাত চেষ্টা করে বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় নিদ্রাহীন, দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত প্রতিটি মূহুর্ত পাড় করছেন এ উপজেলার কৃষকরা।
মঙ্গলবার বিকালে দেখার হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মহাসিং নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছে। আস্তমা গ্রামের কান্দির বিপরীতে, মহাসিং নদীর উত্তরপাড়ে আসামপুর গ্রামের পেছনের অংশ ঘেঁষা দিকদাইড় ফসল রক্ষা বাঁধ। বাঁধের যে অংশে ফাঁটল দেখা দিয়েছিলো সে অংশে মাটির বস্তা দিয়ে আপাতত বাঁধটিকে রক্ষা করা হয়েছে। এটা ছাড়াও আরো ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির করা বেরিবাঁধ থেকে আড়াই তিন হাত নিচে পানি টলমল করছে। আবহাওয়া শান্ত থাকায় মঙ্গলবার পানি তেমন বাড়েনি। যদি সামান্য হারেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে তাহলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে পুরো হাওর তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এ হাওরের কৃষকরা।
এদিকে প্রায় একই অবস্থা সদরপুর সেতুর দক্ষিণ দিকের নাইন্দা নদীর মাথায় নাগডড়া হাওর রক্ষা বাঁধের। পানি দুই-তিন হাত নিচে। তবে বাঁধের উপর আঁচড়ে পড়েছে পানি। এ নিয়ে শঙ্কিত এ হাওরের চাষাবাদ করা কৃষকেরাও।
পানির খবরাখবর জানতে এ প্রতিবেদকের কথা হয় জামখলা, খাইহাওর, পাখিমারা, মাছুখালী, কাঁচিভাঙা, সাংহাই ও খাউয়াজুরি হাওরের একাধিক কৃষকরের সাথে। উপজেলার নদীগুলোতে এতো দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খুব শঙ্কিত তাঁরা। কৃষকরা জানান, ধানের অবস্থা এখনো ক্ষীর। গো-খাদ্য ছাড়া কিছুই না। ধান পাকতে শুরু করবে আরো দুই সপ্তাহ পরে। ততদিন পর্যন্ত যদি হাওর টিকে। নদীর পানি যে হারে বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে দু’একদিনের মধ্যে ‘খরবলা’ ঘটিয়ে ফেলবে। যদি এমন হয় তাহলে কৃষকদের সব স্বপ্ন ধুলিসাৎ করে ফেলবে। আল্লাহ ছাড়া এখন রক্ষা করার আর কেউ নাই।
পাইকাপন গ্রামের কৃষক আলী আহমদ, রীরগাঁওয়ের রয়েজ নূর ও এনাম হোসেন বলেন, জামখলা, পাখিমারা, রাঙামাটি ইত্যাদি বাঁধগুলো নদীর পাশ ঘেঁষা। নদীর পানি বাড়ছে খুব দ্রুত। এভাবে বাড়তে থাকলে বাঁধ ঠিকবে না। বাঁধের কোনো কোনো জায়গায় ফাঁটল দেখা দিয়েছে। এখনো ঠিকে আছে। পানি বাড়লে বাঁধের উপর দিয়ে পানি হাওরে ঢুকতে পারে। আমাদের রাত-দিন কোনো ঘুম নেই। ফসলের চিন্তায় দানাপানি ছাড়া। আল্লাহ রক্ষা করার মালিক।
আস্তমা গ্রামের আলী আসগর, মো. এনামুল হক, কামরূপদলং গ্রামের জাকিরুল ইসলাম বলেন, মহাসিং নদীতে দেওয়া মেইন ক্লোজারগুলোর উপরে অনেক ভয় আছেই, তার উপর কুরুঞ্জির খালের বাঁধ, পার্বতীপুরের বাঁধ যদি ভাঙে, তা ছাড়া আস্তমা গ্রামের দক্ষিণের মাঠ ড্ুেব গ্রাম প্লাবিত হয়ে যদি হাওরে পানি ডুবে তা-ও তো হাওরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এসব নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত।
পরিকল্পনামন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব মো. হাসনাত হোসেন বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে আমরা প্রতিটি বাঁধ পরিদর্শ করছি। কৃষকদের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। আমরা বলেছি, বাঁধে কাজ করতে হলে যা যা লাগে তা করতে। আমরা টিআর কাবিখা থেকে এসবের ব্যয় দেবো। আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি।


