বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘ হ্যাঁ ধান কাটা শুরু হয়েছে, আমাদের দুই-তিন কিয়ার কাটা হয়েছে। এ মুহূর্তে হাওরের পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। তবে অনেক বাঁধের বুরুঙ্গা দিয়ে পানি ঢুকছে, অনেক বাঁধ ও ক্লোজারে ফাটলও দেখা দিয়েছে। যদি বৃষ্টিপাত না হয়, পানি না বাড়ে তাহলে তেমন সমস্যা হবে না। এ জন্য তদারকি করতে হবে।’ জামালগঞ্জের হালি হাওর পারের আছানপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম এ কথাগুলো বলেন।
বাঁধের কাজে ত্রুটি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জোর গলায় বলেন, ‘ত্রুটি—অনিয়ম তো অবশ্যই আছে, গাফিলতিও আছে। পাউবো যে মেজারমেন্ট করেছে তাতে অনেক গাফলা আছে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে দেওয়া হয়নি, যেখানে প্রয়োজন না সেখানে মাটি দেওয়া হয়েছে। ক্লোজারগুলোর অবস্থা যে পর্যায়ে গিয়েছিল যদি পানি না কমত তাহলে বিপদ নিশ্চিত ছিল। সবকিছু মিলে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন।’
জামালগঞ্জে প্রাকৃতিক বৈরিতা উপেক্ষা করে ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষক। হাওর পাড়ের জীবন—জীবিকার অন্যতম উৎস একফসলী। এ সলর ঘরে তুলতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। যদিও জামালগঞ্জের হাওরে ধান কাটা এখনও পুরোদস্তুর শুরু হয়নি তারপরও প্রস্তুতির কমতি নেই কৃষক পরিবারগুলোর মাঝে। কেউ ধান কাটতে শুরু করেছেন, কেউবা ধান শুকাতে খলা প্রস্তুতসহ আনুষাঙ্গিক কাজ এগিয়ে নিতে সারাক্ষণ মাঠেই পড়ে থাকছেন। এ অবস্থায় হাওরবাসী গেল ছয় মাসে কষ্টে ফলানো ফলন ঘরে তুলতে যেমন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছেন, তেমনি ফসল রক্ষা বাঁধ কাজের নানা অসঙ্গতি—অনিয়মের জন্য ক্ষোভও প্রকাশ করছেন তারা।
সম্প্রতি পাহাড়ী ঢলে হাওর ডুবির যে উপক্রম হয়েছিল নদীর পানি কমতে থাকায় কৃষকের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার খবরে কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন হাওর পারের মানুষ। এর চেয়েও কৃষকের বড় কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে সরকার ফসল রক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়ার পরও নানা অনিয়ম—অব্যবস্থাপনার কারণে এ বছর হুমকির মধ্যে পড়তে বসেছিল তাদের একফসলী জমি। কৃষক ও হাওর সচেতন মানুষের অভিযোগ, প্রকৃতিবৈরির পাশাপাশি বাঁধের কাজে প্রকল্প গঠন থেকে শুরু করে নানা অনিয়ম গোটা হাওরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ নিয়ে হাওর পারের মানুষের মাঝে ক্ষোভের অন্ত নেই।
সপ্তাহখানেক আগে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা ঢল কৃষকের গায়ে রীতিমতো কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। গেল কয়দিনের অনুকূল পরিবেশ আর স্থানীয় কৃষক, উপজেলা প্রশাসন ও পাউবোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোনোরকম রক্ষা পায় জামালগঞ্জের হাওর। এ যাত্রায় কৃষকের শেষ রক্ষা হলেও হাওরপারের মানুষের শঙ্কা, ক্ষোভ ও যন্ত্রণা প্রশমিত হয়নি। কারণ ঝড়—বৃষ্টি ও বন্যা এবং ফসল রক্ষা বাঁধ কাজে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির দায়িত্বহীনতা, সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না করা, ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে অসময়ে বাঁশ—বস্তা ফেলার তোড়জোড়, বাঁধের স্লোভে ঘাস না লাগানো, অর্থ ছাড়ে পাউবোর দুরভিসন্ধিমূলক আচরণ, পিআইসি বরাদ্দে মধ্যসত্বভোগী অকৃষককে যুক্ত করার পাশাপাশি নানা অনিয়মের অভিযোগসহ বিগত কয়েক বছরের মতো অনুকূল পরিবেশে নির্বিঘ্নে ফসল তোলার মৌসুম কাটিয়ে সরকারি অর্থ নয়ছয়ের সম্ভাব্য অপচেষ্টায় হাওর জনপদে অস্বস্তি বিরাজ করছে।
গত সোমবার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওর ঘুরে দেখা গেছে, হাওরে ধান এখনও পুরোদস্তুর পাকতে শুরু করেনি। কিছু কিছু অংশে ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে শতভাগ কাটা শুরু হতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগতে পারে। হাওরের বাঁধও যে অবস্থায় আছে তাতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা না হলে তেমন সমস্যা হবে না। যদিও হালি হাওরের ১৫ ও ১৬ নম্বর পিআইসি ও মহালিয়া হাওরের ৮ নম্বর পিআইসিসহ কিছু কিছু বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে, সুরঙ্গপথে হাওরে পানি ঢুকছে এবং ঝুকিপূর্ণ ক্লোজার যেমন— হালি হাওরের ১৩ নম্বর পিআইসির সুইচ্চার খাল, ২০ নম্বর পিআইসির ঘনিয়ারকাড়া, শনি হাওরের ২ নম্বর পিআইসি নান্টুখালিসহ কয়েকটি ক্লোজার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় যদি বাঁধে তদারকি জোরদার থাকে এবং নদীতে পানি না বাড়ে তাহলে কৃষক নির্বিঘ্নে ধান গোলায় তুলতে পারবেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এ বছর জামালগঞ্জের হালি, পাগনা, মিনি পাগনা, শনি, মহালিয়া ও জোয়ালভাঙ্গাসহ ছোট—বড় ৬টি হাওরের ৩৬টি পিআইসির অনুকূলে প্রায় ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ছাড় দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষ। এ বছর বাঁধের কাজ হয়েছে ১৮৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪৮ কিলোমিটার নতুন বাঁধ ও ১৩৭ কিলোমিটার পুরাতন বাঁধে কাজ করেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। চলতি বছরে উপজেলার ছোট—বড় ৬টি হাওরে ২৪ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করেছে কৃষক।
গত ২৭ জানুয়ারি ও ২ মার্চ হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরে বাঁধের কাজ চলাকালীন এ প্রতিবেদক সরজমিন পরিদর্শনে গেলে প্রায় সব বাঁধে পিআইসির অনুপস্থিতি দেখতে পেয়েছে। এছাড়া কোন বাঁধে পিআইসির বদলে অন্তরালের অকৃষিজীবী লোকের আনাগোনা, বাঁধ রক্ষা কাজে প্রচণ্ড ঢিলেমি—দায়িত্বহীনতা, বস্তা—বাঁশহীন অরক্ষিত ঝুঁকিপূর্ণ সব ক্লোজার, নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় পেরিয়েও বাঁধের কাজ শেষ না করার হতাশাজনক বাস্তবতা চোখে পড়েছে। গত ২ থেকে ৬ এপ্রিল আচমকা নদীর পানি বেড়ে কৃষকের স্বপ্ন তলিয়ে যাওয়ার অদ্ভুত পরিস্থিতিতে এ প্রশ্নগুলো সামনে এনেছেন হাওর পারের কৃষক ও সচেতন মানুষেরা। তারা মনে করছেন যদি সময়মতো ফসল রক্ষা বাঁধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে নিয়মতান্ত্রিক সব কাজ শেষ করা হতো তাহলে অসময়ে এসে এমন তাড়াহুড়োর প্রয়োজন পড়ত না।
২০১৭ সালের হাওর বিপর্যয়কালে ফসল রক্ষা বাঁধে অন্যতম ভূমিকা রাখা এমন একজন (পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক) হাওর সচেতন মানুষকে প্রশ্ন করলে তিনি জানিয়েছেন, হাওর রক্ষা বাঁধ কাজে আসলে সিস্টেমের জটিলতা আছে। আর পিআইসিদের গাফিলতি তো আছেই। এছাড়া পিআইসি বরাদ্দেও তথ্য গোপন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃষক সমিতির সুনামগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক ও সিপিবির সাবেক জেলা সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধ কাজে প্রশাসনিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা হয়নি। গত চার বছর প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় কৃষক সুন্দরভাবে ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। এতে প্রশাসন ও পিআইসির লোকেরা বুক ফুলিয়ে বলেছে, তারা কৃষকের ফলন ঘরে তুলে দিয়েছে। এটা আদৌ সত্য নয়, তা এবার প্রমাণিত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে যে বাঁধের কাজ ভালো কি মন্দ হয়েছে তা পরীক্ষা হয় নাই। এ বছর একটু পানি আসাতেই যে অবস্থা হল তাতে বোঝা গেল কাজ কী হয়েছে। যাই হোক পানি চলে যাওয়াতে কৃষক রক্ষা পেয়েছেন। এখন যেহেতু আবার বন্যার আশঙ্কা আছে তাই সংশ্লিষ্টদের বাঁধে তৎপর থাকতে হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ—সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল কবির বলেন, পানি আসার পর যে কাজগুলো করা হয়েছে সেগুলোর করার মতো সিচুয়েশন আগে ছিল না। জামালগঞ্জের কোন বাঁধেই আগে ফাটল দেখা দেয়নি এবং লিকেজ দেখা যায়নি। এখন কোন জায়গায় লিকেজ, কোন জায়গায় ফাটল এটার সিন্ড্রম না আসা পর্যন্ত তো কাজ করা যায় না। আর ক্লোজারগুলোতে ইস্টিমেট অনুযায়ী কাজ হয়েছে। পরবর্তীতে অধিকতর নিরাপত্তার জন্য বাড়তি বাঁশ ও বস্তা ফেলা হয়েছে।
- দুর্নীতি সারা পৃথিবীতেই আছে- পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব
- দেবে গেছে টাঙ্গুয়া ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন গুরমা বর্ধিতাংশের বাঁধ


