জগন্নাথপুরে দাদার হাতে নাতি নিহত, আন্তঃসম্পর্কের এই অবনমনই কি দেখে যেতে হবে?

সামাজিক জীবনে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির যে আন্তসম্পর্ক তা ভেঙে পড়তে পড়তে এখন এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের রসায়নও বিষাক্ত হয়ে উঠছে বলে আমরা দেখতে পাই। রক্তের সম্পর্ক তো সেই কোন আদ্যিকাল থেকেই শত্রুতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সম্পত্তির উপর উত্তরাধিকারিত্ব এবং এর অর্জন নিয়ে দ্বন্দ্ব রক্তের সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলেছে। ভাই-ভাই ঠাই-ঠাই প্রবাদটি সমাজ জীবনের নির্মম বাস্তবতার অভিজ্ঞতাসঞ্জাত প্রবচন। এ থেকে ভাই-ভাই মধুরতম সম্পর্কে বিচ্ছিন্নতার হাহাকার ফুটে ওঠে সত্য কিন্তু সেই হাহাকার মিটানোর কোনো সামাজিক দায় লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু পিতা-পুত্র বা মা-ছেলে সম্পর্কের উপর কেন একই বিদ্বেষ ভাব? পুত্র বা কন্যাকে জন্ম দিয়ে মা-বাবা পৃথিবীর আলো দেখান। অবোধ শিশু অবস্থায় তাকে কোলে কাঁখে করে বড় করে তোলেন, নিজের সর্বস্ব খরচ করে সন্তানকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করে দিতে চান। কিন্তু বড় হয়ে ওই সন্তান পিতা-মাতাকে দুই চোখে দেখতে পারে না। বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে গলগ্রহ মনে করে তারা। আজকাল নাগরিক জীবনে এই সমস্যাটি বেশ প্রকট অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। উপযুক্ত ও সামর্থবান ছেলে নিজের বাবা-মার খোঁজ খবর রাখার সময় পায় না এরকম বাস্তবতা আমাদের চোখের সামনেই প্রচুর দেখা মিলে। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ একটু নির্ভরতা খোঁজে। সম্পর্কের আদিসূত্র অনুসারে বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে সম্মানের সাথে দেখাশোনা করা সন্তানের কর্তব্য। বহু প্রাচীনকাল থেকে আমাদের সভ্যতার এ ছিলো অচ্ছেদ্য রীতি। আজ সেই রীতি ধুলোয় গড়াগড়ি যায়। উন্নয়ন বা সভ্যতার সংকট হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে বিচ্ছিন্নতা নামের এই ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি। এ থেকে বাঁচার ব্যাগ্র ব্যাকুলতা আজ কান পাতলেই শোনা যায়। প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা বিদেশে থাকে আর দেশে ব্যাধিগ্রস্ত পিতা-মাতা রোগশয্যায় অশেষ কষ্ট যন্ত্রণা ভোগ করছেন। এই যন্ত্রণা ভরা দীর্ঘশ^াস কাউকে আকৃষ্ট করে না। বেমালুম ভুলে বসা যায় আজ যিনি বয়সের সুবিধা নিয়ে দুনিয়াদারির চরম সুখ আহরণে ব্যস্ত তিনিও এক সময় বৃদ্ধ হবেন। তখন নিজের পরিণতি কী হবে সে নিয়ে চিন্তা করার মতো মানসিক উৎকর্ষতা হয়নি আজকের যুগের বহু মানুষের। উন্নতির পাশাপাশি এই আন্তসম্পর্কের অবনতি সামনের দিনে আরও ভয়াবহ রূপ লাভ করবে বলে বেশ বুঝা যায়।
এত কথা বলার কারণ হলো, জগন্নাথপুর পৌরশহরের মনোফর আলী ও নূর মিয়া সম্পর্কে বাবা ও ছেলে। তাদের মধ্যে বিরোধ বর্তমান। এই বিরোধের গভীরতা এতই বিশাল যে পিতা পুত্রের মধ্যে লড়াইও বেঁধে যায়। যেমন বেঁধেছিলো বৃহস্পতিবার। তুচ্ছ কারণ, শিশুদের ঝগড়াÑ নিয়ে এই লড়াইয়ের উৎপত্তি। মনোফর আলীদের আঘাতে তারই নিজের নাতি মাসুম মিয়া মারা গেলেন। কী ভয়ংকর কা- চিন্তা করুন। ¯েœহ সর্বাবস্থায় নি¤œগামী বলে আরেকটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। এর অর্থ হলো মায়া মমতা ছেলে হয়ে তার ছেলে অর্থাৎ নাতি-নাতনিদের দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু আলোচ্যক্ষেত্রে এই প্রবাদটিকে মিথ্যা প্রমাণ করলেন নির্দয় মনোফর আলী। এখন হয়তো এ নিয়ে আইন-আদালত হবে। চূড়ান্তভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় খুনীর শাস্তিও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে এই যে নিজের রক্তের উত্তরাধিকারকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে মোনাফর আলী ভয়ানক এক পৈশাচিকতার পরিচয় দিয়ে গেলেন, সেটি কি মুছে দেওয়া সম্ভব হবে? আর মোনাফর আলীর ছেলে নূর মিয়াই বা কেমন পুত্র, যিনি পিতার সাথে বজায় রাখেন রীতিমতো হিংসাত্মক সম্পর্ক? নানা কারণে পিতা-পুত্রের মধ্যে মতবিরোধ হতে পারে। সেটি কেন এমন হবে যে একজন আরেকজনকে খুন করতে দ্বিধা করে না। সম্পর্কের এই নৃশংস অবনমন মানুষের সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নয়। এমন অবনমনকে রোধ করা না গেলে মানুষের জীবন বৃথা।