বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জুনের মাঝামাঝি সময়ে ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে সৃষ্ট স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা থেকে জামালগঞ্জের সবচেয়ে উঁচু আবাসস্থলটিও রেহাই পায়নি। উপজেলার গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগসহ জনগুরুত্বপূর্ণ সব সড়কের উপর দিয়ে ঢেউ খেলেছে অন্তত কয়েক ফুট পানি। কোন সড়কে ছিল প্রায় কোমরসমান পানি, আবার কোন কোন সড়ক তার চেয়েও বেশি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। যে কারণে উপজেলার জনগুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সড়কেরই মারাত্বক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত মেরামত করে চলাচল উপযোগী করে তোলার দাবি এলাকাবাসীর।
জানা যায়, বন্যায় জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ ও জামালগঞ্জ-মান্নানঘাট সড়কের অন্তত ১০-১২ টি স্থানে ভয়ংকর ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। সাচনা-সুনামগঞ্জ সড়কে বড় কোন ভাঙ্গনের সৃষ্টি না হলেও জগাইরগাঁও নামক স্থানে মাঝখানের মাটি সরে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। পরে জরুরী ভিত্তিতে মাটি ফেলে কোনরকম চলাচলের উপযোগী করে তুলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া জামালগঞ্জ-লালবাজার, জামালগঞ্জ-নয়াহালট ও সাচনা বাজার-দুর্লভপুর সড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ ছোট-বড় অনেক সড়ক চলাচল অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। সবকিছু মিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকারও বেশি জানিয়েছে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ভাঙ্গনকৃত রাস্তা মেরামতে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল (ডিপিপি) প্রস্তুতের কাজ চলমান আছে বলেও জানিয়েছে এলজিআরডি।
সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের উজ্জ্বলপুর অংশের দুই-তিন জায়গায় ভয়ংকর ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালের বন্যায় একই জায়গায় বড় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছিল। পরে ব্লক সিস্টেম করে ভঙ্গুর এ সড়কটি মেরামত করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় ব্লকযুক্ত সড়কটি ভেঙ্গেচুরে হাওরে মিশিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গনকৃত অংশ দিয়ে প্রচ- ¯্রােত প্রবাহিত হচ্ছে। একই সড়কের জাল্লাবাজ-বাহাদুরপুর অংশ তীব্র ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। এখানকার একটি সেতুর দুই পাশ ভেঙ্গে যাওয়ায় সেতটি সড়ক বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। সাময়িক যোগাযোগের জন্য সেতুর দুই পাশে বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া এ সড়কের আরও কয়েকটি স্থানে ছোট-বড় ভাঙ্গন দেখা দেওয়ায় জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা সদরের দক্ষিণ কামলাবাজ থেকে নয়াহালট পর্যন্ত রাস্তাটির বেশ কয়েকটি স্থানে মারাত্বক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এ পথ দিয়ে রিক্সা-টমটম দূরের কথা পায়ে হেঁটে চলাই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। স্থানীয়রা ভাঙ্গনের দুই-তিন জায়গায় বাঁশের সাঁকো দিয়ে কোনরকম চলাচলের পথ তৈরি করলেও জরুরী যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে। এছাড়া সাচনা বাজার-দুর্লভপুর সড়কের কয়েকটি স্থানে ভাঙ্গনের ক্ষতিগ্রস্ত দৃশ্যও চোখে পড়েছে। এসব সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে পথচারীদের।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের ৫টি স্থানে বড় বড় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সড়কের তেলিয়া টাওয়ারের কাছে প্রায় ২০ মিটার, উজ্জ্বলপুর অংশে ৪০ মিটার ও আরেক স্থানে ৮০ মিটার এবং জাল্লাবাজ অংশের একটিতে ৩০ মিটার ও অন্যটিতে ২৫ মিটার ভেঙেছে।
জামালগঞ্জ-মন্নানঘাট সড়কের নয়াহালট-চানপুরের মাঝখানের অংশে প্রায় ৩০ মিটার, সোনাপুর অংশে ৩০ মিটার, চানপুর বাজার সংলগ্ন এক জায়গায় ২৫ মিটারসহ সেলিমগঞ্জ-বাহাদুরপুর অংশে ২৫ মিটার জায়গার মাটি সরে সড়কটি ভয়ংকর অবস্থায় পতিত হয়েছে। সবকিছু মিলে সড়কে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ দুই সড়কের প্রায় ১০-১২টি স্থানে ছোট-বড় অনেক ভাঙ্গন দেখা দেওয়ায় সড়ক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভাঙ্গনকৃত স্থানের প্রায় ৮টি স্থানে ব্রিজ নির্মাণসহ প্রটেকটিভ ওয়াল দিয়ে রাস্তা মেরামত না করলে এ সড়ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে উপজেলা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। এছাড়া উপজেলার জামালগঞ্জ-লালবাজার, জামালগঞ্জ-নয়াহালট এবং সাচনা বাজার-দুর্লভপুর সড়কের অনেক জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে।
জাল্লাবাজ গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বন্যার পানির ধাক্কায় জাল্লাবাজ-বাহাদুরপুর গ্রামের মাঝখানের সড়কে বেশ বড় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হইছে। এইখানে একটা ব্রিজ আছে, এই ব্রিজের দুই সাইডের জায়গা ভাইঙ্গা তছনছ হইয়া গেছে। এখন গাড়ি-টারি চলাচল বন্ধ। যাতায়াতে আমরার মারাত্বক সমস্যা হইতাছে। তাড়াতাড়ি ভাঙ্গা জায়গাগুলো ঠিক করন লাগব।’
ভীমখালী ইউনিয়নের চেলাইয়া গ্রামের বাসিন্দা ও জামালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নিজাম নুর বলেন, ‘লালবাজার সড়ক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভীমখালী ইউনিয়নের আটগাঁও ও ফেনারবাঁক ইউনিয়নের প্রায় সবাই লালবাজার সড়ক দিয়ে উপজেলা সদরে যাতায়াত করে। বন্যার পরপরই ভাঙ্গাচুরা এ সড়ক দিয়ে হাসপাতাল যাওয়ার সময় এক ডেলিভারী রোগীর পথেই সন্তান প্রসব হয়ে যায়। এ অবস্থায় জরুরী ভিত্তিতে বন্যাক্রান্ত রাস্তাগুলো সংস্কার করা দরকার।’
এ ব্যাপারে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, আমরা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার সব তথ্য আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দিয়ে দিয়েছি। এখন কোথায় কি করতে হবে সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবেন। সে মোতাবেক কাজ হবে।
- উপজেলা ঘোষণার এক বছরের মাথায় ইউএনও পেল মধ্যনগরবাসী
- ব্যয় কমাতে, দ্র্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ৮ সিদ্ধান্ত


