বিল সেচে মাছ ধরাই জামালগঞ্জের নিয়ম

আকবর হোসেন ও হাবিবুর রহমান, জামালগঞ্জ
চলতি মৌসুমে জামালগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ জলমহালে মেশিন দিয়ে তলা শুকিয়ে মাছ ধরার মহোৎসব ছিলো। এক শ্রেণীর অসাধু ইজারাদার ও সাব ইজারাদাররা এই মহোৎসবের মূল হোতা। অনেক জলমহালের তীরবর্তী গ্রামবাসী জলমহাল শুকানোর জন্য লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও কোন ফল পাননি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
আবার কোন কোন জলমহালের ইজারাদার ও সাব ইজারাদাররা প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ায় কেউ আর অভিযোগ করেন নি। অভিযোগের পর স্থানীয় সাংবাদিকরা সরেজমিন পরিদর্শন করে সংবাদ প্রকাশের পর রাজনৈতিক দলের নেতা ও ইজারাদারদের লোকদের ধারা হুমকির সম্মুখিন হয়েছেন। ছোট বড় জলমহাল মিলিয়ে কয়েকটি জলমহালে অভিযোগ হলেও কার্যকর হয়েছে মাত্র একটিতে।
জলমহালের আশপাশের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, বিল-বাদাল ও সব জলমহাল মেশিন দিয়ে সেচে মাছ ধরাই এখানের আইন হয়ে গেছে। কে কাকে বাধা দিবে। সবাই এসব অবৈধ কাজের সাথে জড়িত। প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোন ফল পাওয়া যায় নি।     
মোবাইল ফোনে জানিয়েও কোন কাজ হয় না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযোগের পর অধিকাংশ অভিযোগের তদন্তভার উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তার উপর পড়লেও তিনি দায়সাড়া ভাবে কাজ করেছেন।
উপজেলার এলজিইডির হিলিপ প্রকল্পের জলমহালগুলি স্থানীয় সুবিধাভোগীদের ব্যবহারের কথা থাকলেও সেগুলো সাব ইজারা দেওয়া হয়।  ইজারাদাররা ইচ্ছে মত তলদেশ শুকিয়ে জলমহালের মাছ ধরেন। একদিকে যেমন প্রতারিত হয়েছেন কৃষকরা, অন্যদিকে জলমহাল শুকানোর কারণে মা মাছ এমনকি পোনা মাছ হয়েছে নিধন।
তবে ফেনারবাঁকের দত্তউজা বিল সেচার অভিযোগ পাওয়ার পর শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিনে ওই জলমহালে গিয়েছিলেন। ইজারাদারদের লোকদের মেশিন বন্ধ ও সেচতে নিষেধ করে আসার পরও রাতের আধারে হ্যাজাক লাইট দিয়ে বিলটি সেচা হয়েছে। এলাকাবাসী রাতেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আবারও বিষয়টি জানিয়েছেন। পর দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জলমহাল সেচার ঘটনায় ইজারাদারকে আটক করে থানায় রাখেন। রাতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট টিটন খীসা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জলমহালের ইজারাদার গোলাম সাকলাইন দীপককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দত্তউজা বিলে আরো দুটি মেশিন লাগিয়ে জলমহাল শুকানোর কাজ চলছিলো বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
এলাকাবাসী ও হাওড় পাড়ের কৃষকদের দাবী  যারা জলমহাল শুকিয়ে নিয়ম ভেঙ্গে মাছ ধরেছে তাদের জলমহালের লিজ বাতিলের। এরকম হলে ভবিষ্যতে কেউ জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরবে না।
উপজেলার সবচেয়ে বেশী জলমহাল ফেনারবাঁক ও বেহেলী ইউনিয়নে। এর মধ্যে এবছর ফেনারবাঁক ইউনিয়নে বিল সেচার হিড়িক পড়েছিলো। রীতিমত উৎসবের মত ছিলো। এক ইজারাদার আরেক ইজারাদারের সাথে পাল্লা দিয়ে বিল সেচা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিল সেচার আগেই সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়, স্থানীয় নেতা ও কয়েকজন সাংবাদিককে খুশী করলে এই জলমহাল শুকানোর কাজ নির্বিঘেœ করা যায়। ইজারাদারা এলাকার প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ায় এলাকার সাধারণ মানুষ যেমন ভয়ে মুখ খুলেন নি তেমনি স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তর দেখেও না দেখার ভান করে থেকেছেন।
সজেমিনে গিয়ে দেখা যায় ফেনারবাঁক ইউনিয়ন ও ভীমখালী ইউনিয়নের ছয়হারা গঙ্গাধরপুর মৌজার ছয়হারা নদীতে স্থানীয় নাম ঢালা বিলে ২টি পাওয়ার পাম্প মেশিন দিয়ে চলছে বিল সেচার কাজ। একই ভাবে ভীমখালী ইউনিয়নের তেরানগরের ব্রীজের পাশে দোলতা নদীতে একটি বড় পাওয়ার পাম্প দিয়ে সেচা হয়েছিলো। কাশীপুর ও লক্ষীপুরের গ্রামের মাঝামাঝি গুল বিলে বড় কয়েকটি পাওয়ার পাম্প দিয়ে বিল সেচা হয়েছে।
গঙ্গাধরপুর গ্রামের সামনে লম্বা বিলে ও বিনাজুড়ার সামনে লম্বা বিলেও মেশিন দিয়ে বিল শুকানো হয়েছিলো। গুল বিলের সাব ইজারাদাররা বিল সেচে ছিলো। একইভাবে লক্ষীপুরের পাশে চাটনী বিলের ইজারাদার ও তার লোকেরা বিল সেচে ছিলো। রাজাপুর ব্রীজের সংলগ্ন দোলতা নদীর অপর অংশে মেশিন ও পানি সেচের পাম্প নিয়ে সেচা হয়েছিলো। ইজারাদাররা বিভিন্ন মৎস্যজীবি সমিতির নামে বন্দোবস্ত এনে নিজেরা সাব লিজ নিয়ে থাকেন, ইজারাদাররা সরকারী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তারা অধিক লোভের আশায় মেশিন দিয়ে শুকিয়ে জলমহালের তলা থেকে মাছ ধরে থাকেন। তলা শুকিয়ে মাছ ধরার কারণে এলাকার সাধারণ মানুষজন বঞ্চিত হচ্ছেন। ফেনারবাঁক ইউনিয়নের উড়া বিল, বেহেলীর কসমা বিল, হালির হাওরের কইয়ার বিল, ঘনিয়ার বিল, সাচনা বাজার ইউনিয়নের দোপাপসি বাউসা বিলও মেশিন দিয়ে তলা শুকিয়ে মাছ ধরেছে।
অভিযোগ উঠেছিলো ফেনারবাঁক ইউনিয়নের চাটনী বিলের সাব-ইজারাদার আওয়ামী লীগ নেতার ভাতিজার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সাংবাদিকরা জলমহালের ছবি তুলতে গেলে বাধা প্রদান ও বক্তব্য নেওয়ার সময়ও দাম্ভিকতার সুরে বলে- যা পারো লিখো, লিখলে কিছুই হবে না।  
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জলমহাল না শুকানোর জন্য বিলের পানি দিয়ে গোসল করার জন্য মানবিক আবেদনও করেছিলেন ফেনারবাঁক ইউনিয়নের উজান ও ভাটী দৌলতপুরের ৫০ জন কৃষক পরিবার।  কিন্তু ফল পায়নি গ্রামবাসী।  এরকম উদাহরণ একটি দুটি নয় প্রায় শতাধিক।
এভাবে জলমহালের পানি সেচে মাছ ধরার ফলে দেশীয় প্রজাতির চির চেনা মাছ যেমন শিং, মাগুর, কই, টেংরা, পুটি, শোল, টাকি, বাইলা, মিনি, বেদা, গুলসাইয়া, রানী, বাইম, কটকইট্টা, কইলা, পাবদা,ঘইন্যা, তারা বাইম, মকা, ইছা, তিতনা সহ ইত্যাদি মাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় গোপালপুরের মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের একাধিক মৎস্যজীবি জানিয়েছেন, এখন আর আগের মতো মাছ নাই। থাকবো কি কইরা, মাটির তলা থেকে মাটি খুড়ে মাছ ধরা হয়, এভাবে চললে ঔষধ খাওয়ানোর জন্যও আর দেশী মাছ পাওয়া যাবে না ।
এলজিইডির হিলিপ প্রকল্পের মৎস্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন,‘ মেশিন দিয়ে পানি শুকিয়ে মাছ ধরা হয়নি। পানি একটু কমানো হয়েছে।’ কথা বলার এক পর্যায়ে লাইন কেটে দেন তিনি।
জলমহাল সেচায় ইজারাদারদের সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন,‘আমরা যখনই যেখানে খবর পেয়েছি সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে অবগত করেছি। জেলার মধ্যে সব চেয়ে বেশী ব্যবস্থা নিয়েছি আমরা।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খীসা বলেন,‘ আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। একটি সমিতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’