বোরো আবাদ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা
জেলেদের রুটি রুজির পথ বন্ধ
বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘পানি যদি এইভাবে কমতেই থাকে তাহইলে বোরো চাষাবাদ করতে আলগা সেচ লাগব। যা সাধারণত আমাদের লাগে না। বোরো জমি লাগানির পরে আমরা মাঘ মাসে সেচ দেই। হাওরে যদি আর পানি না হয় তাহইলে টানের জমিগুলো হাল তোলার আগেই শুকাইয়া ফাইট্যা যাইব। এই অবস্থায় প্রথমদিকেই জমিতে সেচ দেওন লাগব। এরপর নীচের জমি যখন চাষের সময় হইব তখন হাওরে পানি থাকব না। এইভাবে সম্পূর্ণ হাওর জুইড়াই যদি সেচের পানি দিতে হয় তাহলে নতুনভাবে সেচের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হইব।’
কথাগুলো বলছিলেন শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের মামুদনগর গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। বোরো চাষাবাদে আগাম শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর জমি করছিলাম ৬০ বিঘা। এই বছর আরও কম করমু। কারণ ধারণা করতাছি হাওরে পানি কমায় বিভিন্ন সঙ্কট দেখা দিব। এমনিতেই জমি কইরা বিঘাপ্রতি যে উৎপাদন খরচ হয় তাতে তেমন লাভবান হওয়া যায় না। হাওরে পানি না আইলে এইবার উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হইব।’
ভর বর্ষা মৌসুমে এসেও সুনামগঞ্জের হাওর-বাওড় ও নদ-নদীর পানি শুকিয়ে মড়া কার্তিকের রূপ ধারণ করেছে। বর্ষার এ সময়টায় যে জায়গায় জেলেরা মাছ শিকার করে ব্যতিব্যস্ত থাকার কথা সেখানে গরু-বাছুর ঘুরে ফিরে কাঁচা ঘাসের স্বাদ গ্রহণ করছে। সর্বত্র পানিস্বল্পতা দেখা দেওয়ায় কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। গেল বোরো মৌসুমে অকাল বন্যাসহ বর্ষা মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা আঘাত আনায় হাওর পারের কৃষিজীবী মানুষকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। এর মাঝে পানির ভর মৌসুমে এসেও হাওরে পানি না থাকায় বোরো বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষকসহ হাওর ও পরিবেশ সচেতন মানুষেরা। শনিবার বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা যেন থেকেই যাচ্ছে কৃষকের মনে।
জামালগঞ্জের কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা যায়, সাচনা বাজার-সুনামগঞ্জ সড়ক লাগোয়া ছনোয়ার হাওরের মাঝখানের একাংশ শুকিয়ে সবুজ ঘাস গজিয়েছে। সেখানে ফুটবল খেলছে কিশোর ও যুববয়সী ছেলেরা। জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলাবেষ্টিত বৃহত্তম হালি হাওরের অধিকাংশ জায়গা শুকিয়ে হেমন্তের আবহ বিরাজ করছে। বর্ষার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী হালি হাওরের এই শুকনো অংশ ঢের পানিতে নিমজ্জিত থাকার কথা থাকলেও সেখানে গৃহপালিত পশুর বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের রামপুরের ধলা, সাচনা বাজার ইউনিয়নের ভরতপুর গ্রাম সংলগ্ন রৌয়ার হাওর, বেহেলী ইউনিয়নের রাজাপুর ও রহিমাপুর গ্রামসংলগ্ন ছোটখাটো হাওরের চারপাশ শুকিয়ে শাইল ক্ষেত ভেসে উঠার দৃশ্য চোখে পড়েছে।
জানা যায়, আয়তন ও জনসংখ্যার হিসেবে হাওরাঞ্চলের বড় জেলা সুনামগঞ্জ। পুরো জেলাই প্রায় হাওরবেষ্টিত। এখানকার অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি ও মৎস্য আহরণ। হাওরে পানি না থাকায় কৃষক ও জেলে উভয়ের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পড়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই স্মরণাতীত বন্যা সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। এতে ক্ষেত-খামারসহ সবকিছুতেই ক্ষতির ক্ষত এখনও দৃশ্যমান। এর আগে পাহাড়ি ঢলে অকাল বন্যা দেখা দেওয়ায় প্রথম দফা ক্ষতির মুখে পড়ে বোরো চাষীরা। পরবর্তীতে বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় আউশের বীজতলা। এ অবস্থায় যদি হাওরে পানি না আসে তাহলে বোরো চাষে সেচ সঙ্কটসহ নানা বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। যদিও রোপা আমনে তেমন শঙ্কা নেই, তবে পানি এভাবে কমতে থাকলে বোরো আবাদে মারাত্বক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রকৃতিগত দুর্যোগে এ রকম একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসলে হাওরপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা কোথায় গিয়ে ঠেকবে সে প্রশ্ন সকলের।
কেন্দ্রীয় হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, হাওরে যেভাবে পানি কমতে শুরু করেছে তাতে বোরো চাষাবাদে মারাত্মক বিপর্যয় ঘনিয়ে আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই রেস কাটিয়ে উঠা আসলে অসম্ভব। এভাবে একের পর এক প্রকৃতিগত বিপর্যয় কৃষকেরা আর কত সামাল দিবে। বর্তমান পানিস্বল্পতার বিপদ কাটিয়ে উঠতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পর্যাপ্ত পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বললেন, অসময়ে পানি আসা আর সময়মতো পানি না থাকাটা আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। হাওরাঞ্চলে বর্তমান যে পানিশূন্য অবস্থা এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সঙ্কট উত্তোরণে খাল-বিল, ডোবা-নালা ও নদ-নদী খনন জরুরী। এতে একদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ হবে আরেকদিকে জলাশয়ে পানির ধারণক্ষমতাও বাড়বে। তখন সেচ সঙ্কটও কিছুটা কাটবে। আর পানিহীন সেচ সঙ্কট মোকাবেলায় জ্বালানি তেল ডিজেলে বাড়তি ভর্তূকি দিয়ে বোরো চাষাবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানিয়েছেন, বর্তমান শুষ্ক পরিস্থিতিতে প্রকৃতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিস্কার প্রতীয়মান হচ্ছে। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে একটা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। তারপরও হয়তো আমরা বোঝতে পারব, আসলে হাওরের কী অবস্থা হবে। যদি বৃষ্টি হয় তখন পানি বাড়বে। সাধারণত এ অঞ্চলে ভাদ্র মাসের শেষ দিকে পানি হয়। আর যদি বৃষ্টিতে পানি না হয়, তাহলে বোরোর ক্ষতির আশংকা বেশি।
তিনি আরও জানান, এ মুুহূর্তে হাওরে রোপা আমন ধান চাষ হচ্ছে। এখন হাওরের যে পরিস্থিতি সেটা রোপা আমনের জন্য একদম উপযোগী। আমাদের ৮১ হাজার হেক্টর রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা আশাকরছি অর্জন হবে। আমনের ৬০ ভাগ (শনিবার পর্যন্ত) লাগানো শেষ হয়েছে। গেল বন্যায় ১৯ হাজার হেক্টর আউশের প্রায় অর্ধেকের বেশি নষ্ট হয়েছে। বন্যায় বীজতলাও তলিয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ-১ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বললেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। শুধু আমাদের দেশেই নয় সমস্ত বিশ্বেই জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। কোথাও বন্যা হচ্ছে, আবার কোথাও বৃষ্টি নেই শুষ্ক পরিবেশ বিরাজ করছে। বোরো মৌসুমের নির্দিষ্ট একটা মৌসুম থাকে। সেটা নভেম্বরের শেষ দিকে কিংবা ডিসেম্বরের শুরুতে। হাওরে যেহেতু পানিশূন্য ভাব দেখা দিয়েছে সেহেতু বোরো চাষে কৃষকদের একটু আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
- মুক্তিযুদ্ধার তালিকায় ‘রাজাকারের’ নাম/ অভিযোগ করায় মুক্তিযোদ্ধার ভাতা স্থগিত !
- বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: পরিকল্পনামন্ত্রী


