বন্যার ক্ষতি পোষানোর প্রতিশ্রুতি দরকার বন্যা মোকাবিলার স্থায়ী উদ্যোগ

সাম্প্রতিক ভয়াল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের জন্য সর্বোচ্চ সরকারি বরাদ্দ প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কেএম আলী আজম। বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সচিব এই আশ্বাস প্রদান করেছেন। তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়কসহ সকল যোগাযোগ সড়ক সচল করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ প্রদান করেছেন। সরকারের পক্ষে এমন ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করায় আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই।
এ বছরের ভয়াল বন্যা সুনামগঞ্জের জন্য বিরল এক অভিজ্ঞতা। অন্তত এক শ’ বছরের মধ্যে এমন বন্যার ইতিহাস কারও জানা নেই। বলা যেতে পারে ইতিহাসের সবচাইতে বড় ও বিধ্বংসী বন্যায় কবলিত হয়ে সুনামগঞ্জবাসী অপূরণীয় ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দ্রুত গতিতে পানি ঢুকার কারণে কেউ সাবধান হওয়ার সুযোগ পাননি। ঘরের মালামাল ও জরুরি দলিলপত্রও সরানোর সময় দেয়নি এই প্রলয়ংকরী বন্যা। গ্রামাঞ্চলের কাঁচা ঘরবাড়িরর শতভাগ ধসে গেছে বন্যায়। নি¤œবিত্ত এই বিশাল জনগোষ্ঠীটি বসবাসের ছোট কুটির ও ঘরে থাকা বসবাসের সামান্য উপকরণ হারিয়ে আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারায় পরিণত হয়েছেন। এই বন্যার আগে আকস্মিক ঢলে জেলার একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্বল বাঁধ ব্যবস্থাপনার কারণে পানির তোড় সামলাতে ব্যর্থ হয় এসব বাঁধ। বন্যায় সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যোগাযোগের সড়ক। জেলার এমন কোনো সড়ক নেই যা এবারের বন্যার থাবা থেকে রক্ষা পেয়েছে। এইসব ভাঙাচুড়া রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করতে যেয়ে প্রতিনিয়ম মানুষ অশেষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। তাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ব্যবস্থাসহ ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের কাজ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদন করা উচিৎ। আশার কথা হলো, সুনামগঞ্জের এই বিস্তৃত ক্ষতির বিষয় সরকারের নজরে আছে যার প্রতিফলন আমরা জ্যেষ্ঠ সচিবের কথায় শুনতে পেলাম।
এবারের বন্যার পর আমাদের নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে। প্রায় সকলেই বলছেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল নেমে যাওয়ার পথ না পাওয়ায় ভাসিয়েছে জনপদ। উজানের পানি ভাটিতে আসবে এমন নির্জলা সত্য অনুধাবন করেই আমাদের বন্যা মোকাবিলার উপায় ভাবতে হবে। আমাদের প্রায় সকল নদ-নদী নাব্যতা হারিয়েছে। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণের কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। সকল জলাশয় ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এসব কারণে বন্যার ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা প্রতি বছরই বাড়ছে। সামনের বছরগুলোতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে যদি না এখনই উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সরচাইতে জরুরি, নদ-নদীগুলোর গতিপথ ঠিক করে এগুলোর নাব্যতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। হাওরের বাঁধ নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। হাওরে যেকোনো ধরনের সড়ক নির্মাণ একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে এর ফল হিতে বিপরীত হয়। এই প্রাকৃতিক নিয়মকে মেনে মানুষের বিবেচনাবোধ বাড়াতে কঠোর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। বন্যায় এবারের ক্ষতি পোষানোর সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী বন্যা মোকাবিলার উপায় উদ্ভাবন ও কার্যকর করা ভাটি অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি। আমরা আশা করব সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে উপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতির যে ভালো অবস্থা তৈরি হয়েছিলো, বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেই অবস্থাকে পেছনে টানবে। একটি সুদূরপ্রসারী ভালো পরিকল্পনা ও উদ্যোগই কেবল পারে এই পতন ঠেকাতে।