যক্ষ্মা প্রতিরোধের কাজ করছেন ১২৩ জন তৃণমূল সেবিকা

ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ
যক্ষ্মা রোগটি আর আগের মতো ভয়াবহ নই। সঠিক চিকিৎসায় রোগটিকে সারিয়ে তোলা যায়। সকল বয়সের মানুষের মাঝে এই রোগ হতে পারে। তবে বড়দের তুলনায় শিশুদের যক্ষা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের কাজটি খুব কঠিন। এই কঠিন কাজটি জামালগঞ্জে সফল ভাবে করে যাচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ।
উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের ছেলাইয়া গ্রামের দিনমজুর নুরকামাল হঠাৎ করে সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হন, কোন ভাবেই সুস্থ হতে পারছিলেন না। তিনি কাজে যেতে না পারায় পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। তখন স্থানীয় সেবিকা, লোক মুখে দীর্ঘদিনের কাশির কথা জানতে পারেন, দেরী না করে একই গ্রামের স্বাস্থ্য কর্মী মাহমুদা বেগম বাড়িতে গিয়ে কফ নিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। পরীক্ষায় কফে যক্ষ¥ার জীবাণু পাওয়া যায়। তাই তার বুক এক্সরে করার ব্যবস্থা করেন, সেখানেও একই ফলাফল। সব পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে নুর কামালকে নিয়মিত যক্ষার ঔষধ সেবনের পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় ঔষধ দেয়া হয়। ছয়মাস স্বাস্থ্য কর্মীর সামনেই ডটস পদ্ধতিতে ঔষধ সেবন করে নুর কামাল এখন সুস্থ্য।
এ বিষয়ে নুরকামাল বলেন, যক্ষ্মার হওয়ার কথা শুনে প্রথমে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তবে গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শে ছয় মাস ঔষধ খেয়ে এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ্য।
উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নে বদরপুর গ্রামের রেনু বালা (৬০) একবছর আগে থেকে কাশিতে ভুগছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝে উঠতে পারেননি যে, তার যক্ষ¥া হয়েছে। স্বাভাবিক মনে করেই চলতে থাকে তার দিনকাল। এর এই মধ্যে স্থানীয় বেহেলী গ্রামের স্বাস্থ্য সেবিকা তুলনা রানী রেনুবালার দীর্ঘ দিনের কাশির কথা জানতে পারেন। দেরি না করে তিনি রেনু বালার বাড়িতে চলে যান। যক্ষ¥ার লক্ষণ দেখে কফ সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ করেন। স্বাস্থ্যকর্মীর অনুরোধে পরদিন কফ সংগ্রহ করেন তিনি। কফ নিয়ে যথাযথ পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে ফলাফল পজেটিভ আসে। এরপর পাঁচমাস স্বাস্থ্যকর্মী তুলনা রাণীর সামনে ডটস পদ্ধতিতে ঔষধ সেবন করছেন রেনুবালা। ইতিমধ্যে দুইবার ফলোআপ কফ পরীক্ষা করা হয়েছে। আর মাত্র একটি পরীক্ষা বাকী আছে। রেনু বালার অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই উন্নতির দিকে।
স্বাস্থ্য সেবিকা তুলনা রানীর মতো জামালগঞ্জ উপজেলায় যক্ষা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ব্র্যাকের ১২৩ জন তৃণমূল স্বাস্থ্য কর্মী। এছাড়াও একজন প্রোগ্রাম অর্গানাইজার, দুইজন ফিল্ড অর্গানাইজার, তাদের অসামান্য অবদানে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে হাজারও যক্ষ¥ারোগী।
রেনুবালা বলেন, তোলনা আপা খুব ভাল মানুষ। আমাকে প্রতিদিন উনার সামনে ঔষধ খেতে হয়। যক্ষ¥া ধরা পরার পর আমার ভয় হচ্ছিল। অনেকে বলেন যার হয় যক্ষা, তার নাই রক্ষা। কিন্তু ব্র্যাকের চিকিৎসায় আমি ভাল হয়ে উঠছি।
ব্র্যাক স্বাস্থ্যকর্মী তোলনা রাণী বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমার সামনে ঔষধ খেয়ে ৪০/৪৫ জন রোগী ভাল হয়েছে। বর্তমানে আমার ৩টি রোগী আছে। যারা প্রতিদিন সকালে আমার বাড়িতে এসে ঔষধ খেয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, এলাকায় আমাকে সকলেই ব্র্যাকের যক্ষ¥ার ডাক্তার আপা বলে ডাকে। আমি ব্র্যাকের সহায়তায় যক্ষ¥া রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
উপজেলা ব্র্যাকের যক্ষ¥া নিয়ন্ত্রক কর্মসূচীর উপজেলা ফিল্ড অর্গানাইজার শামসুল আবেদীন জনি বলেন, জামালগঞ্জ উপজেলাকে যক্ষামুক্ত করতে সরকারের পাশাপাশি ব্র্যাক অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২২সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত তিনশত আটজন যক্ষ¥া রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ্য করা হয়েছে। আরোও দেড়শতাধিক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মঈন উদ্দিন আলমগীর জানান, বর্তমানে সব রোগীরাই হাতের কাছেই সেবা পাচ্ছে। যক্ষ¥া রোগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত রোগীদের কোন প্রকার অর্থ খরচ ছাড়াই সুস্থ্য করে তোলা হচ্ছে। ব্র্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মীরা রোগীদের সামনে রেখে ডটস পদ্ধতিতে ঔষধ খাইয়ে সুস্থ্য করে তুলছে। আগে যক্ষ¥ার কফ পরীক্ষার জন্য সুনামগঞ্জে পাঠানো হতো। কিন্তু বর্তমানে যক্ষা রোগীদের চিকিৎসার সেবায় যক্ষ¥া রোগ এবং ঔষধ প্রতিরোধেই রোগ নির্ণয়ের জন্য উন্নত প্রযোজনীয় ল্যাব আমাদের হাসপাতালেই আছে। যার কারণে সুনামগঞ্জ, সিলেট রোগীদের যেতে হচ্ছে না। ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকাদের প্রসংশা করে তিনি বলেন, তারাই বাংলাদেশের যক্ষা প্রতিরোধের প্রধান সৈনিক।