হঠাৎ করে প্রাথমিকে পুনরায় বৃত্তি পরীক্ষা কেন?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গতকাল সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হয়। চলতি ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এই বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সব ধরনের পরীক্ষা বন্ধ করে শ্রেণি মূল্যায়নের ভিত্তিতে ফলাফল নির্ধারণের একটি চিন্তা করার জন্য অনেকেই নানাভাবে মতামত ব্যক্ত করে আসছেন তখন হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষা চালুর এই সিদ্ধান্ত আমাদের অবাক করে। প্রাথমিক পর্যায়ে এখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃত্তি প্রদান করা হত। সমাপনী পরীক্ষাটি বিদ্যালয় নিয়ন্ত্রিত নয় বলে এতে মেধার মূল্যায়ন নিয়ে তেমন প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। মোটামুটি এই পদ্ধতিটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গিয়েছিলো। এখন হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষা চালু করার সিদ্ধান্ত আসায় বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরা বেশ বিপাকে পড়বেন বলে অনুমিত হয়।
২০২০ সনে করোনা মহামারীর আবির্ভাবের পর প্রায় এক বছর বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। পরের এক বছরও ভালোভাবে শ্রেণি কার্যক্রম চালানো যায়নি। এবছর কেবল বিদ্যালয় ও শ্রেণি কার্যক্রমকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় দুই বছর শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণ ও আত্মস্থকরণ প্রক্রিয়া বহুলাংশে বিঘিœত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপর এই সংকট সবচাইতে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২০ সনে যে ছাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলো সে অটোপাস পেয়ে এবার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই ছাত্রটি যখন সমাপনী পরীক্ষার পর পুনরায় বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিবে তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে? পরীক্ষা জুজুর কারণে এতে বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সুতরাং কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের উপর পরীক্ষার বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে তার বিগত দুই বছরের শিক্ষা ঘাটতি কীভাবে ধীরে ধীরে দূর করা যায় সে নিয়ে চিন্তা করাই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা শিক্ষার্থীর মনোজগত তৈরিতে সবচাইতে বেশি ভূমিকা রাখে। এজন্য শিশুদের চাপমুক্ত পরিবেশে শিক্ষা দান করাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। মানসিক বিকাশের পর্যায়ক্রমিক ধারায় প্রতিযোগিতামূলক বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সাথে সে পরিচিত হবে। আমাদের দেশে যেভাবে শিশু শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার বেঞ্চিতে বসিয়ে দেয়া হয় তা উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় না। যেসব কারণে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া আটকানো যায় না পরীক্ষা ভীতিও তার অন্যতম। আমরা একটি আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের মতো শিক্ষা ব্যবস্থা দেখতে চাই। জাতীয় অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে হয়তো এক লাফে সেই জায়গায় পৌঁছানো যাবে না। তবে গতিপথ ওই লক্ষ্যাভিমুখী থাকলে একটা সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। কিন্তু আমরা যেভাবে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদল করি, পরীক্ষা-নীরিক্ষা করি; তাতে ওই গন্তব্যে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে।
ডিসেম্বর মাস শেষ হতে বেশি দেরি নেই। শিক্ষার্থীরা সমাপনী পরীক্ষার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। শিক্ষার্থীরা যাতে আর নতুন কোনো চাপে না পড়ে সে জন্য বৃত্তি পরীক্ষা চালু করার সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। আমরা আশা করব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাববে। মেধার বিকাশের সাথে অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিত্তবান পরিবারের সন্তান যে পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানের জন্য তা চিন্তার বাইরে। এই উভয় শ্রেণির মেধার বিকাশ সমানভাবে হতে পারে না। এই জায়গায় আগে কাজ শুরু করা উচিৎ।