আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন আজ/ মানুষের মনের কথা ঘোষণা হয়ে ফুটে উঠুক

দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আজ ২২তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন। ২৩ জুন ১৯৪৯ সনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে যে রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিলো কয়েক বছরের মাথায় ১৯৫৫ সনে সেই দলটি নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে দেশের সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বশীল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামে তৎকালীন রাজনীতির মোড় পরিবর্তনের বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সনে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে সেই রাষ্ট্রের জন্মের পরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসী বুঝতে পারেন রাষ্ট্রটি প্রকৃত অর্থে তাদের নয়। পশ্চিমা শাসক-শোষকদের উপনিবেশ হয়েই রয়ে গেছে বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও সম্ভাবনার প্রাচুর্যে ভরা এই অংশটি। জনগণের বঞ্চনা ও ক্ষোভের মর্ম অনুভব করে যে সংগঠনটি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আশা ও আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলো সেই সংগঠনই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মূলত আওয়ামী লীগের জন্ম না হলে আমরা আজ যে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছি তা সম্ভব হত না। পুরো পাকিস্তান আমল আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতিসত্ত্বার উন্মেষ ঘটিয়ে স্বাধীকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার হয়ে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে এই দেশ ও জাতিকে নিয়ে আসতে রেখেছে ধারাবাহিক ভূমিকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের এক মহান নেতার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এই সংগঠনটি পদ্মা মেঘনা যমুনা সুরমার উত্তাল বেগ ধারণ করে। বঙ্গোপসাগরের গর্জন উঠে সারা দেশে। বিচক্ষণতা, সময়োচিত পদক্ষেপ, কৌশলী কর্মসূচি, সাহস; সবকিছুর সমন্বয় ঘটেছিলো এই সংগঠনে। তাই একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা লাভে সমর্থ হই। আজ এই সংগঠনটির ২২ তম জাতীয় সম্মেলন । ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চে দিনব্যাপী এই সম্মেলন শেষে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি সংগঠনের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। আমরা ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলের জাতীয় সম্মেলনের সর্বতো সফলতা কামনা করি।
আওয়ামী লীগের এই সম্মেলন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যখন টানা তিন মেয়াদে দলটি ক্ষমতায় আছে এবং আর এক বছর পরই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; তখন এই সম্মেলন সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে। অনুমিত হয় আজকের সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা ঘোষণা করবে। ইতোমধ্যে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের নতুন অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। সম্ভবত এই শ্লোগানের আলোকেই তৈরি হবে নতুন রূপকল্প। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সকল রাজনৈতিক দলকেই জনগণের চাহিদাকে আমলে নিতে হয়। একবিংশ শতকের আধুনিক মন মানসিকতার নাগরিক সমাজ কী ভাবছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের আকাক্সক্ষা কী, দেশ কোন পথে উন্নয়নের স্বর্ণশিকড়ে আরোহণ করবে; সে-সবই একটি রাজনৈতিক দলের বিবেচনার মধ্যে থাকে। তাই আজ সম্মেলন থেকে কী ধরনের ঘোষণা আসছে তা জানার জন্য পুরো দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ।
রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামী লীগের বিশাল অর্জনের সাথে কিছু ঘাটতির কথাও বহুলভাবে আলোচিত। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল বিস্তৃত দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে না পারা, অবাধে বিদেশে অর্থ পাচার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাগামছাড়া কর্মকা-; প্রভৃতি কারণে দলটির বহু অর্জনকে আজ ম্লান করে দিয়েছে। সামনের দিনে জনমন জয় করে জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকতে চাইলে অবশ্যই দলটিকে এইসব জায়গায় নজর দিতে হবে। আমরা আশা করি দলটি এই সম্মেলনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিবে। এছাড়া, গণতন্ত্র, সুশাসন, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের বাংলাদেশ গঠন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে দেশ গঠন; প্রভৃতি জায়গায়ও দেশবাসী ক্ষমতাসীন দলটি কী ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করে তাও জানতে চায়।