‘ইকবাল কাগজী
ঠাকুরগাঁয়ের এক জবরদস্ত রাজনীতিক নেতা আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর দাবি তাঁর বাবা প্রভুত ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। আর তিনি ছিলেন দাতা কর্ণের মতো দানবীর। যাকে তাকে জমি দিয়ে গেছেন। পত্রিকার (কালের কণ্ঠ, ২১ ডিসেম্বর ২০২২) প্রতিবেদনে ভোক্তভোগীর ভাষ্য উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, “তারা কাগজপত্র মানে না। আমাদের কাছে দলিল আছে। কিন্তু আপেল বলে, ‘কিসের দলিল ?’ এ জমি আমার বাপ—দাদার। তোমরা এখানে কেন আসছো ? লাত্থি মেরে তুলে দিমু’ !” তারপর লেখা হয়েছে, ‘ঠাকুরগাঁও জেলা যুবলীগের সভাপতি আবদুল মজিদ আপেলের বিরুদ্ধে এমন হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করে কালের কণ্ঠকে বলছিলেন জমির মালিক মহিদুলের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা বেগম।’ অর্থাৎ বাবার বিক্রয় করা জমি আপেল ফেরত চান এবং এ কারণে দলিল করে বিক্রয় করা জমিকে ‘বাপ—দাদার’ জমি করে নিয়েছেন, বাবাকে বানিয়ে ফেলেছেন দাতা কর্ণ। এমতাবস্থায় মনে হচ্ছে ঠাকুরগাঁয়ের জমিদারের কোনও উত্তরসূরি যদি জীবিত থাকেন তবে তাঁর উচিৎ ঠাকুরগাঁয়ের সব জমি তাঁকে ফেরত দেওয়ার জন্য দাবি তোলা, কেন না একদা তাঁর বাপ—দাদারা ঠাকুরগাঁওয়ের সব জমির মালিক ছিলেন।
বুঝতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না যে উক্ত নেতা দখলবাণিজ্যে বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। কেবল তিনিই নন, দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে অদূর অতীতে প্রকাশিত এমন অনেক সংবাদ পাওয়া যাবে, যে—গুলোতে ‘আপেল আতঙ্ক’র মতো আতঙ্ক ছড়ানো অনেক সন্ত্রাসী ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং এমনটা মনে করার কোনও অবকাশ নেই যে, এইসব কুকীর্তির কথা প্রশাসন জানে না। দৈনিক কালের কণ্ঠের খবর থেকে আবদুল মজিদ আপেল সম্পর্কে জানার সৌভাগ্য হয়েছে দেশবাসীর, তেমনি হয়েছে দেশ যারা পরিচালনা করেন তাঁদেরও। এ সম্পর্কে গত বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর ২০২২) কালের কণ্ঠের শিরোনাম ছিল “ঠাকুরগাঁয়ে এক নেতার দখল সন্ত্রাস \ আপেলের হুমকি ‘গুচ্ছগ্রামে চলে যাও, মেরে ফেলব’।” ঠাকুরগাঁও থেকে ফিরে সংবাদ করেছেন পত্রিকার দুই সাংবাদিক। আগের দিন বুধবারের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ঠাকুরগাঁয়ে আপেল আতঙ্ক’। কোনও একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এইটুকুই কি যথেষ্ট নয় ?
সংবাদপ্রতিবেদন যে—সব বার্তা পরিবেশন করছে সে—গুলো কোনও কোনও সিনেমার ‘জোর যার মুল্লুক তার’ পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে মিলে যায়। মনে হয় সিনেমার কাহিনীগুলো এখানে বাস্তবে ঘটে চলেছে। একজন অত্যাচারিত হবে, প্রতিকার চাইতে গেলে দেখা যাবে প্রতিকার চাওয়ার পথঘাট সবগুলোই ইতোমধ্যে কী এক যাদু বলে যেনো বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রকাশ্যে সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী কেউ মুখ খুলছে না। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা গাঁয়ের মুরুব্বি—মাতব্বর কারও কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে গিয়ে পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। সকলেই ধরি মাছ না ছুঁই পানির জবরদস্ত কারিগর বনে গেছেন। কোনও কোনও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনও কোনও এলাকায় এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, অনুসন্ধানে বিগত কয়েক বছরে এমন ঘটনার দেদার উদাহরণ উপস্থিত করা যাবে, অনায়াসে। এই বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে যে—কোনও সচেতন মানুষের কাছে মনে হতে পারে যে, নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বশংবদে পর্যবসিত হয়েছে সমগ্র সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভেতরে আর একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েছে, যেখানে ওই ব্যক্তি বিশেষ বা ওই ব্যক্তিবর্গের কথাই আইন, এর কোনও অন্যথা হওয়ার কোনও অবকাশ নেই। রাষ্ট্রের যেমন বাহিনী থাকে তেমনি এই বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গেরও সশস্ত্র বাহিনী আছে, যারা সন্ত্রাস করে বেড়ায়। ওই ব্যক্তি বিশেষ বা ওই ব্যক্তিবর্গের কথার কোনও অন্যথা হলে ব্যবস্থা হিসেবে লাঞ্ছনা, লাষ্ঠ্যৌষধি, এলাকা থেকে বিতাড়ন, এমনকি খুন পর্যন্ত হতে পারে অর্থাৎ কোনও রকমের কোনও নিরাপত্তা বলে কীছুর বালাই থাকে না।
সচেতনজনের জানা আছে যে, কোনও কোনও দেশে অপরাধীদের সংগঠিত বৃহৎ দল বা চক্র থাকে, যে—গুলো সাধারণ্যে গোপন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন অর্থাৎ মাফিয়া বলে সমধিক পরিচিত। এইসব সংগঠন সন্ত্রাস, হিংসা, হত্যা, অপহরণ, দখলচ্যুতি, সম্পদ লুণ্ঠন ইত্যাদি সমাজবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক শক্তিগুলো কর্তৃক রাজনীতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। এইসব ব্যক্তি বা সংস্থার কাজ একটাই ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বাড়ানো ও সমস্ত সুযোগ সুবিধার মালিক হয়ে উঠা। এমন কোনও কোনও সংস্থার বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ এতোটাই বিশাল হতে পারে যে, এমন কি নিউইয়র্কের স্টক এক্সচেঞ্জে বিক্রয় করা স্টক ও শেয়ারের চেয়েও সেটা বেশি। আমাদের দেশে যখন কোনও কোনও এলাকায় ‘আপেল আতঙ্ক’ মাফিক কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে তখন বুঝে নিতে হবে যে, ওইসব ঘটনাবলী এ দেশে মাফিয়ার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।
মাফিয়া মানে ধন উপার্জনের জন্যে সংগঠিত চক্রের অপরাধ সংঘটন। কোনও দেশ যখন সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়, যে যা—ই বলুন, তার কারণ একটাই। আর সেটা হলো, সামাজিকভাবে অন্যায্য ও নৈতিক মূল্যবোধবর্জিত কোনও সামাজিক—আর্থনীতিক ব্যবস্থা সেখানে বস্তুতপক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। হয় তো দেখা গেলো ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য কোনও কৃষককে জেল দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ৫,০০০,০০,০০,০০০ (পাঁচ হাজার কোটি) টাকা ঋণ পরিশোধের অপারগতার জন্য কোনও ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদকে জেলে পুরা হচ্ছে না, তিনি থাকছেন দিব্যি মুক্ত।
সমাজ ও রাষ্ট্র পরিসর থেকে এইরূপ সকল অসাম্য ও অন্যায্যতাকে উৎখাত করতে হবে। যে সামাজিক—আর্থনীতিক ব্যবস্থার অধীনে, যে—রাজনীতিক ব্যবস্থার অধীনে এইরূপ আমানবিকতা ঘটে,সেটাকে পাল্টে না দিতে পারলে দিকে দিকে মাফিয়ার উত্থান ঘটতেই থাকেবে, সাধারণ মানুষের নির্যাতনের কাল আরও আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে, জনতার আতঙ্ক উত্তরোত্তর বাড়বে বই কমবে না। এমনকি এইসব অপরাধীদেরকে বিচারের সম্মুখিন করাও হয়ে পড়বে অতন্ত কঠিন এবং বিচার করে কারাগারে বন্ধ রাখাটা হবে আরও বেশি কঠিন। কারণ পুঁজিবাদের পতাকাতলে সব কীছুই বিক্রয়যোগ্য, সুতরাং জেল থেকে মুক্তিক্রয়ও সহজেই সম্ভব।
কথা হচ্ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের ‘আপেল আতঙ্ক’ নিয়ে । সেই আতঙ্কের হোতা, তিনি নাকি আবার ‘নেতা’ও। এই ‘নেতা’ কোন্ দল করেন, কোন্ পদে আছেন এবং কী নাম তাঁর, সে—সব খবর জানার আপাতত জনগণের কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কিন্তু তাঁর কার্যকলাপ প্রমাণ করছে যে, দেশে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি কার্যকর আছে এবং প্রকারান্তরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অবিরাম অপরাধ সংঘটন ও বিপরীতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন থাকা জনতার পক্ষে মঙ্গলজনক কীছু নয় বা হতে পারে না। মানুষকে জানতে হবে এবং বুঝতে হবে এর কারণ কী এবং এই কারণ নির্মূলে উদ্যোগ নিতে হবে, সকলে মিলে প্রতিরোধ করতে হবে, রুখে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে কোনও এক ‘নেতা’৬০/৭০ জনের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মারধর করে লোকজনের ঘরবাড়ি দখল করে নেবেন, সরকারি দিঘী দখল করে মৎস্যচাষ করবেন, লোকজনদেরকে খুন করার হুমকি দেবেন এবং এমনকি টেন্ডার প্রদানের প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুন ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কীছু করেই দিব্যি পার পেয়ে যাবেন, আইন তাঁর টিকিটি পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না। কথা উঠেছে আলোচ্য ‘নেতা’ একজনকে খুন তো করেছেনইÑ তলে তলে সমাজ সেটা জানে, প্রকাশ্যে স্বীকার করে না, মুখ বুজে থাকেÑ এবং এমনকি তার স্ত্রীকেও রেহাই দেননি, পরকীয়ার প্রতিবাদ করার অপরাধে তাঁর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছেন। এমনটা কী করে হয়, এসব কী করে চলতে দেওয়া যায় ? একদিকে গ্রামান্তরের লোকজন তাঁর অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে উঠবেন কিন্তু অপরদিকে ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’র মতো করে সব কীছু অস্বীকার করবেন, সমাজ—সংসার, রাজনীতিক শক্তি, প্রশাসন নীরব থাকবে, কী করে হয় ? যদিও সাংবাদিক নীরব থাকেন নি, কালের কণ্ঠ সংবাদ করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে দেশে কি আইন নেই, দেশের চেয়ারম্যান , মেম্বার, মাতব্বর কিংবা রাজনীতিক দলের জনপ্রতিনিধি ও কর্মীরা কি নেই ? তাঁরা আছেন এবং বহালতবিয়তে আছেন নিজেদের জায়গাতেই। কিন্তু এতো কীছুর পর রাজনীতিক দল, প্রশাসন কীছুই জানতে পারছেন না, এমনটা কী করে হয় ? আসলে সকলেই তলে তলে সব কীছু জানেন, কিন্তু না জানার ভান করেন। কারও করার কীছু নেই, কীছু করার সব পথ বন্ধ। থানা জানলেও অভিযোগ পাওয়া যায় নি এই অজুহাতে হাত পা গুটিয়ে রেখেছেন, প্রকারান্তরে প্রমাণ করছেন জানেন না। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসের কাছে অসহায় এবং কার্যত প্রশাসন অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। যদি তাই না হবে, ‘আপেল আতঙ্ক’র উদ্ভব হলো কেন, এর উৎসটির মুখে ছিপি আটকে দেওয়া যাচ্ছে না কেন ? সংবাদে উল্লেখিত খুন, দখল, মারামারি, দিঘী দখল অথবা বাবার বিক্রি করা জমি নিজের বলে জবর দখল করে ফেলা ইত্যাদি অন্যায়—অত্যাচার প্রতিরোধ করা কী এতোই কঠিন ? আইন তো আছে, আইন প্রয়োগ হচ্ছে না কেন ? প্রশাসন যদি সত্যিকার অর্থেই এইসব অন্যায় ও বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিহত করতে ব্যর্থ, তবে এই ব্যর্থ প্রশাসনকেও বদলে যেতে হবে, ব্যর্থ প্রশাসনের কোনও দরকার নেই দেশের ও দেশের জনগণের। ভুলে গেলে চলবে না, প্রশাসনের ক্ষমতার বাইরে কিংবা আইনের উর্ধে কেউ নয়, তুচ্ছ কিংবা মহামান্য সকলেই এর আওতায় পড়েন এবং এখানে সবাই সমান।
ঠাকুরগাঁয়ে অরাজক অবস্থা বিদ্যমান, সেখানে চলছে মাফিয়া মাফিক আপেলের রাজত্ব, পত্রিকার ভাষায় সে—রাজত্বের নাম ‘আপেল আতঙ্ক’। এমন অবস্থা বোধ করি কেবল ঠাকুরগাঁওয়েই নয়, তলে তলে কমবেশি দেশের সর্বত্রই বিরাজ করছে।
অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক বরং না হওয়াটা অস্বাভাবিক। তাঁদের যুক্তি এই যে, যদি কোনও দেশে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ চলতে থাকে তবে এমনটাই হয়। ক্রোনি ক্যাপিটালিজম হলো আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ এই তিন শ্রেণি জোট বেঁধে কোনও দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলে সে—দেশে একটি গোষ্ঠীতান্ত্রিকতার (অলিগার্কি) উদ্ভব ঘটে এবং অনিবার্যভাবে নৈরাজ্যিকপরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশে বিলক্ষণ তারই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দেশে যতই উন্নয়ন হোক, আরও বেশ ক’টি পদ্মা সেতু হয়ে যাক না কেন দেশে ‘আপেল আতঙ্ক’ বিরাজিত থাকলে সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আমরা কেবল একটা কথাই বলতে চাই, শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশ যতোটা এগিয়েছে সে—অগ্রগতির লাগাম টেনে ধরবেন না, দয়া করে এইসব ‘আপেল আতঙ্ক’র হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করুন, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে প্রতিরোধ করুন।


