দরকার ব্যাপক সামাজিক উদ্যোগ/ বিদ্যালয় দুইটিকে বাঁচিয়ে রাখুন

এই জনপদের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কালক্রমে এর অনেকগুলো জাতীয়করণ করা হয়। সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা একসময় আগ্রহ নিয়ে ব্যাপকভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র-সমাজ ও যোগ্য নাগরিক গঠনের যৌক্তিক সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় কত মানুষ কতভাবে ভূমিকা রেখেছেন তার হিসাব মিলানো কষ্টকর। এখন সেরকম সামাজিক দায়বদ্ধতার তেমন দেখা মিলে না। শহরে এখন শিক্ষায় বেসরকারি উদ্যোগগুলো নিছক বাণিজ্যিক প্রয়াসে পরিণত হয়েছে। আগের মত মহৎ উদ্দেশ্য তাড়িত হয়ে সমাজের মঙ্গলের জন্য এখন অনেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে এগিয়ে আসেন না। এটি সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত নমুনা। এরকম শিক্ষাবিমুখ সময়ে দুইটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর নিরতিসয় বেদনার। এরকমই বেদনাদায়ক একটি সংবাদ দেখা গেলো গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম এই দুইটি প্রতিশ্রুতিশীল বিদ্যালয় হলো সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং দিরাই উপজেলার বামাচরণ নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়।
সংবাদ তথ্য অনুসারে গোবিন্দপুর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি পরিচালিত হত ওয়াকফকৃত একটি জলমহালের আয় দিয়ে। হঠাৎ করে জলমহালটি ব্যক্তি বিশেষকে ইজারা দেয়ার কারণে বিদ্যালয়ের আয় বন্ধ হয়ে পড়ে। সংগত কারণেই অর্থাভাবে বিদ্যালয়ের কাজে ভাটা আসে। কেন দীর্ঘদিনের প্রথার ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিদ্যালয়ের পরিবর্তে ব্যক্তিবিশেষকে জলমহাল ইজারা দেয়া হলো? গ্রামের কোনো পক্ষ কি চায় না বিদ্যালয়টি চালু থাকুক, অথবা বিদ্যালয় নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের জের কি এটি? অন্যদিকে দিরাইর বামাচরন বিদ্যালয়টি নামকরণের দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ হওয়ার পথে। একপক্ষ চাচ্ছেন বামাচরণের নামেই পরিচালিত হোক বিদ্যালয়টি আরেক পক্ষ চাচ্ছেন গ্রামের নামে পরিচালিত হতে। উভয় ক্ষেত্রেই এই দ্বন্দ্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার আলোকবর্তিকা জ্বালার প্রতিষ্ঠান দুইটি। দ্বন্দ্ব মিটানোর কোনো শক্তিশালী স্থানীয় উদ্যোগও দৃশ্যত অনুপস্থিত।
বাংলাদেশে এখন শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। শিক্ষার্থীদের হাতের নাগালের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। ফলত সুযোগের অভাবে বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। গত কয়েক দশকে এই জনপদে ক’টি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তার পরিসংখ্যান নিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এরকম অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত দুইটি বিদ্যালয়ের অপমৃত্যু শিক্ষার সুযোগের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাই আমাদের উচিৎ এই বিদ্যালয় দুইটির সমস্যার সমাধান করে এগুলোকে আরও কার্যকর করে গড়ে তোলা।
আমরা মনে করি বেসরকারি ওই দুই বিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে স্থানীয় উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক বেশি। যারা শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেন তাঁদের গা ঝাড়া দিয়ে একাট্টা হতে হবে। যেসব দ্বন্দ্ব সমস্যা রয়েছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। সবার আগে এলাকার শিশুদের কথা ভাবতে হবে। বড়দের কারণে ছোটদের সুযোগ সংকুচিত হলে একসময় সেই দায় তাদের গ্রহণ করতে হবে। সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্বিকার হয়ে বসে থাকলে চলবে না। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নামের বিষয়ে সরকারি বিধি বিধানকে মান্যতা দেয়ার জায়গায় সকলে একমত হলে সমাধান কঠিন কিছু নয়। সরকারি বিধান মানার বিষয়টি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। গোবিন্দপুর বিদ্যালয়ের আয়ের উৎসটিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে গ্রামবাসীকে এক হতে হবে। এরপর বিদ্যালয়গুলো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসলে সরকারি সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার দিকে এগোতে হবে। মনে রাখতে হবে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দলে জর্জরিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে সকলেই ভয় পায়। তাই বিদ্যালয় দুইটি নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দল নিরসন করতে হবে আগে।
বামাচরণ নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশপাশের ১৪টি গ্রামে কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। গোবিন্দপুরের অবস্থাও এর চাইতে খুব ভালো হওয়ার কথা নয়। এমতাবস্থায় এই বিদ্যালয় দুইটিকে বাঁচিয়ে রাখা সকলের একান্ত কর্তব্য।