বাঁধ ব্যবসাকে প্রতিহত করে ফসলের সুরক্ষা করুন

‘বাঁধ ব্যবসা’- সাম্প্রতিককালে একটি নতুন শব্দবদ্ধ হয়ে উঠছে। বাঁধ ব্যবসাটি কেমন? গতকাল এর একটি সামান্য চিত্র ফুটে উঠেছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের শারফিন স্কুল ও আনন্দপুরের মাঝখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১০ বছর আগে একটি সড়ক নির্মাণ করেছিলো। স্থানীয় দায়িত্বশীল এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ছোটখাট বন্যায় এই সড়ক কখনও তলিয়ে যায় না। এবার ওই জায়গায় ২০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দায়িত্বশীল ওই ব্যক্তি বলেছেন, পাশের মাদারিয়া বাঁধের সাথে আরও লাখ দুয়েক টাকা যুক্ত করে দিলেই এই জায়গাটি সংস্কার হয়ে যেত। তৎপরিবর্তে ২০ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করার নামই হলো বাঁধ ব্যবসা। এরকম অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ছড়াছড়ি হাওরজোড়ে। অথচ প্রয়োজনীয় জায়গায় সঠিকভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয় না। সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ করা যায় না। বাঁধের মান বজায় রাখা হয় না। অর্থাৎ সামান্য পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রকল্পের অধিকাংশ বরাদ্দকে মুনাফায় পর্যবসিত করাই হয়ে উঠে বাঁধ ব্যবসায়ীদের মুখ্য উদ্দেশ্য। যে কারণে কোনো বছরই মাঝারী আকারের আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষা করতে এসব বাঁধ তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। গত মৌসুমে এরকম মাঝারী মানের আগাম বন্যার কারণে হাওরে ব্যাপক ফসল হানি ঘটেছিলো। তবু প্রতিবছর বাঁধ হয়। কারণ আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে এখন পর্যন্ত বাঁধকেই একমাত্র সহায় হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
হাওরের ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ কোনো ব্যবসার উপলক্ষ হওয়ার কথা ছিলো না। ২০১৭ সনের ব্যাপক ফসল হানির পর গড়ে উঠা আন্দোলনের ফলে ঠিকাদারি প্রথার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসাবে বিবেচিত পিআইসি প্রথায় আসার মূল কারণ ছিলো কৃষক ও এলাকাবাসীর সমন্বয়ে স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে বাঁধগুলো নির্মাণ করা। কিন্তু সময়ের সাথে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ভালো ব্যবস্থাটিও আজ বিতর্কিত হয়ে গেছে। পিআইসিতে যারা বিভিন্ন খঁুটির জোরে অন্তর্ভুক্ত হন তারা মূলত হাওরের ফসল রক্ষার জন্য তাড়িত থাকেন না। তারা বেশি করে তাড়িত থাকেন বাঁধের কাজ করে কত বেশি লাভ তুলা যায় তা নিয়ে। এই ব্যবসাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষও নানাভাবে ভূমিকা রেখে চলেছেন। অর্থাৎ ঠিকাদারি ও পিআইসি, সেই যা ঘরকা তা বাহিরকা অবস্থা হয়ে গেছে। সকলেই এরকম অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চান।
বর্তমান সরকারের কর্মমেয়াদের শেষ বছর এটি। জনসন্তুষ্টি ধরে রাখা এখন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। নানা কারণে সরকারের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে বলে বিরোধী মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে। এরকম অবস্থায় সরকার চাইবে না কোনো কারণে জনগণের বিরাগভাজন হতে। স্থানীয় নেতৃত্বকে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। হাওরাঞ্চলের বিশাল কৃষক সমাজ বোরো ফসল নিয়ে সবসময় উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় থাকেন। বাঁধের কারণে যদি তাদের এই উদ্বেগ বেড়ে যায় তাহলে তা সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক পয়েন্ট যোগ করবে। তাই সরকারি দলকে মাঠ পর্যায়ে বাঁধ নির্মাণের কাজকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে এবং এই হাওর ও ফসলরক্ষার সেবামূলক কাজকে যারা ব্যবসায় পরিণত করতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের প্রতিহত করতে হবে। তারা কি সেটি করে দেখাতে পারবেন? এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারলে হাওরবাসী বিশাল কৃষক সমাজের কাছে মুখ উঁচু করে দাঁড়ানোর মত অবস্থা থাকবে না।
অপ্রয়োজনীয় যেসব প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার জন্য আমরা বাঁধ নির্মাণের সাথে জড়িত সকল পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।