লাগামহীন চিকিৎসা ব্যবস্থা/প্রয়োজন গণমুখী রাষ্ট্রীয় কাঠামো

‘চিকিৎসার লাগামহীন ব্যয়ে নিঃস্ব মানুষ’ শিরোনামে বৃহস্পতিবার দৈনিক সমকাল পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। স্বাস্থ্য অর্থনীটি ইউনিট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে চিকিৎসা ব্যয় মিটাতে যেয়ে বছরে ৮৬ লাখ মানুষের দারিদ্রসীমার নীচে নেমে যাওয়ার এক করুণ বাস্তবতার তথ্য উঠে এসেছে। বলাবাহুল্য চিকিৎসাগ্রহীতাদের ৬৮.৬ শতাংশ ব্যক্তি এখন নিজেরাই চিকিৎসা ব্যয় বহন করেন। আমরা যারা এই সমাজে বসবাস করি তারা চিকিৎসা করাতে যেয়ে বিপর্যস্ত বহু পরিবারের এমন অবস্থা কম-বেশি জানি। কারণ এরকম দৃষ্টান্ত আমাদের পরিবার, আত্মীয় পরিজন, পাড়া প্রতিবেশীগণের জীবনে প্রায়ই ঘটতে দেখি। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় প্রান্তিক পর্যায়ে অবস্থান করেন। এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যথাযথ চিকিৎসা নিতে পারেন না টাকার অভাবে। ফলে এমন পরিবারের গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি অপচিকিৎসা, অপূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও বিনাচিকিৎসায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মধ্যবিত্ত বা নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয় মিটানোর জন্য সম্পদ ও সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। সবচাইতে দুঃখজনক হলো, এমন একটি নিপীড়নমূলক চিকিৎসাব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেটুকু চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ আছে তাও পর্যুদস্ত হয় চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতদের চরম দুর্নীতি, অনান্তরিকতা এবং জনবলের অভাবে।
প্রতিবেদনে চিকিৎসা ব্যবস্থার এই সংকটের জন্য ঔষধের মাত্রাতিরিক্ত দাম, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ব্যয় প্রভৃতিকে চিহ্নিত করা হয়। কেন ঔষধের এত দাম? এ সম্পর্কে ঔষধ কোম্পানি কর্তৃক চিকিৎসকদের উপহার প্রদানকে একটি প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। চিকিৎসকদের চেম্বারে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভীড় লক্ষ করা যায়। এরা নিজেদের কোম্পানির ঔষধ ব্যবস্থাপত্রে লিখার জন্য চিকিৎসকদের সাথে মধ্যস্থতায় নিয়োজিত থাকেন। এই মধ্যস্থতা এমনি এমনি হয় না। নানা ধরনের অনৈতিক সংযোগ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের কিছু চিকিৎসক তদবির নির্ভর হয়ে ব্যবস্থাপত্র লিখেন যা শেষ পর্যন্ত রোগীদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি প্রধান অভিযোগ হলোÑ আমাদের চিকিৎসকরা রোগীদের নিকট থেকে মোটা অংকের ফিস নেন বটে কিন্তু তাদের সময় দেন একেবারেই কম। রোগী বুঝতে পারেন না কী তার সমস্যা ও করণীয়। রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে নৈকট্য স্থাপন না হওয়ার কারণে যথাযথ চিকিৎসা পাওয়াও সংকুচিত হয়। বিদেশে রোগীদের চলে যাওয়ার পিছনে এই রোগী-চিকিৎসক নৈকট্যের অভাবকে বহুলাংশে দায়ী করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানে চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকারের পর্যায়ভুক্ত করা আছে। কিন্তু এজন্য সর্বজনীন ও সুষম কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। বিনা চিকিৎসায় কোনো নাগরিকের মৃত্যুবরণ হবে নাÑ আমরা সবসময় এরকম একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো দেখতে চাই। কবে সেরকম হবে জানি না। কিন্তু এরকম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ সমাজের ভিতর থেকে জারি আছে। আমাদের ক্রমাগত এই দাবির কথা জানিয়ে যেতে হবে যাতে একটা সময়ে এই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিষয়টি জানা আছে। কিন্তু দুর্নীতি দূর, বাণিজ্যবৃত্তি বন্ধ ও আন্তরিকতা বাড়াতে পারলে এই সামর্থ দিয়েই বহুদূর যাওয়া যায়। রোগীরা যদি এরকম পরিবেশ দেখেন তাহলে তারা অল্প প্রাপ্তি নিয়েও সন্তুষ্ট থাকবেন। দেশের নাগরিকরা এমন অবিবেচক নয় যে তারা অতিরিক্ত কিছু চেয়ে বসবেন। আমরা গণমুখী একটি চিকিৎসা কাঠামোই দেখতে চাই। এটি কেবল চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। এটি সার্বিকভাবে রাষ্ট্রীয় আদর্শের সাথে সম্পর্কিত। রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি গণমুখী চিন্তার প্রতিফলন থাকে তাহলে অপরাপর জায়গার মতো চিকিৎসাক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তাই আসুন রাষ্ট্র পরিচালনায় গণমুখী ব্যবস্থা প্রবর্তনে সকলে নিয়োজিত হই।