বৃৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো মানুষের মিলনমেলা

এম.এ রাজ্জাক, তাহিরপুর
শ্রীশ্রী অদ্বৈত জন্মধাম পণতীর্থে পুন্যস্নান এবং হযরত শাহ আরেফিন (র.) ওরশ মোবারকে তাহিরপুরে লাখো মানুষের মহামিলনমেলা জমে উঠেছে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে জনজোয়ার নামে দুই ধর্মের পুন্যার্থীদের। রবিবার রাত ৯টা ১৪মিনিট ১৫সেকেন্ড থেকে ৪টা ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে (মহাবারুণী) গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে এদিকে রবিবার শুরু হয়েছে রাজারগাঁওয়ের নিকটবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় শাহ আরেফিনের মোকামে হযরত শাহজালালের (র.) সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিনের (র.) বার্ষিক ওরস মোবারক। চলবে ২২ মার্চ পর্যন্ত।
আগে থেকেই বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে সকাল থেকেই কখনও টিপটিপ আবার কখনও প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যেই রাজারগাঁওয়ে যাদুকাটা নদীর তীরে শ্রীশ্রী অদ্বৈত জন্মধাম পণতীর্থ ও সীমান্তবর্তী লাউড়েরগড় সাহিদাবাদে শাহ আরেফিন (র.) মোকামে জড়ো হন ভক্ত আশেকানরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পুন্যার্থীদের উপস্থিতি। পুন্য¯œান ও ওরস উপলক্ষে বসেছে মেলাও। ধারণা করা হচ্ছে, এবার শাহ আরেফিন (র.) প্রাঙ্গণ এবং পণাতীর্থ গঙ্গাস্নানে প্রায় ৫ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে পুন্যার্থীরা ওরশ প্রাঙ্গণ, অদ্বৈত প্রভুর আখড়া বাড়ি, গড়কাটি ইসকন মন্দির, হাট-বাজার, স্থানীয় গ্রামগুলোতে জমায়েত হয়েছেন।
হযরত শাহ আরেফিন (র.) আস্তানার সহ সভাপতি, বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন জানান, ভারতের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অভ্যন্তরে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও হযরত শাহজালাল (র.) ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সফরসঙ্গী হযরত শাহ আরেফিন (র.) আস্থানায় বার্ষিক ওরস উদযাপনের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রবিবার সকালে মাহফিলের মাধ্যমে শুরু হয় ওরস। আগামী মঙ্গলবার (২১মার্চ) আখেরী মোনাজাতের মাধ্যমে ওরস শেষ হবে। এক সপ্তাহ আগ থেকে ওরসে যোগ দিতে হাজারো কাফেলাধারী ভক্তবৃন্দরা সমবেত হয়েছেন আস্তানা প্রাঙ্গণে। ওরশ উপলক্ষে আস্তানার আশপাশে বসেছে নানা বাহারী খেলনার দোকান।
বাদাঘাট ইউনিয়নের রাজাগাঁও শ্রীশ্রী অদ্বৈত জন্মধাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল জানান, রবিবার রাত ৯টা ১৪মিনিট ১৫সেকেন্ড থেকে ৪টা ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে (মহাবারুণী) গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিকট সপ্তগঙ্গার মিলনকেন্দ্র খ্যাত পণতীর্থে ¯œানযাত্রা উৎসবকে ঘিরে রাজারগাঁও আখড়াবাড়ি ও যাদুকাটা নদীর চরে শনিবার থেকেই বসেছে হরেক রকম খেলনা -খাদ্য সামগ্রী ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্থায়ী হাজারো দোকানপাট।
তাহিরপুর থানার ওসি সৈয়দ ইফতেখার হোসেন জানান, ওরস ও ¯œানযাত্রাকে ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই থানার পুলিশ ছাড়াও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও সড়কে চারস্তরের কড়া নিরাপ্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুপ্রভাত চাকমা বলেন, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর ভ্রাম্যমাণ আদালত সর্বদাই প্রস্তুত রয়েছে। যে কোন ধরণের অপতৎপরতা প্রতিরোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, আনুমানিক ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দের মাঘ মাসে শ্রীশ্রী অদ্বৈত আচার্য তাহিরপুর উপজেলার লাউড় পরগণার অন্তর্গত নবগ্রামে আবির্ভূত হন। তবে নবগ্রাম যাদুকাটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু আগেই। বর্তমানে অদ্বৈত আচার্য প্রভুর মন্দির গড়ে উঠেছে নবগ্রাম সংলগ্ন রাজারগাঁওয়ে। ‘অদ্বৈত প্রকাশ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, একদিন রাত্রিতে অদ্বৈত জননী নাভাদেবী স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি নানা তীর্থ জলে স্নান করছেন। প্রভাতে তিনি স্বপ্নের কথা স্মরণ করে ও তীর্থ গমনের নানান অসুবিধার বিষয় চিন্তা করে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এমন সময়ে পুত্র অদ্বৈতাচার্য সেখানে উপস্থিত হয়ে মাতার বিমর্ষতার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁর মাতা তাঁকে স্বপ্ন দর্শনের কথা অবহিত করেন এবং তীর্থযাত্রায় অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। অদ্বৈাতাচার্য্য মাকে বিষন্ন দেখে পণ করলেন যে, এই স্থানেই সকল তীর্থের আবির্ভাব করাবেন। অদ্বৈতাচার্য মন:শক্তির অসীম প্রভাব ও যোগবলের অসাধারণ শক্তিতে তীর্থ সমূহকে আকর্ষণ করে লাউড়ের এক শৈলের উপর আনয়ন করেন। ঐ শৈল খ-ের একটি ঝরণাতীর্থবারি পরিপূরিত হয়ে ঝরঝর করে পড়লে লাগলো। অদ্বৈত জননী তাতে স্নান করে পরিতৃপ্তা হলেন। এইভাবে লাউড়ে এই তীর্থের উৎপত্তি হয়। অদ্বৈতের ন্যায় তীর্থ সমূহও পণ করেছিলো যে, প্রতি বারুণীতেই এই স্থানে তাঁদের আবির্ভাব হবে। এই পণ শব্দ থেকেই নাম হয়েছে পণাতীর্থ।
এদিকে রাজারগাঁওয়ের নিকটবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় শাহ আরেফিনের মোকামে হযরত শাহজালালের (র.) সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিনের (র.) বার্ষিক ওরস মোবারক শুরু হচ্ছে আজ। ৩৬০ আউলিয়াদের মধ্যে হযরত শাহ আরেফিন (র.) হলেন একজন। প্রকৃতপক্ষে হযরত শাহ আরেফিনের (র.) মোকাম সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে অবস্থিত হলেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলমান নর-নারী ওরস মোবারকে আসেন এবং দূর থেকে মোকাম জিয়ারত করেন। দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকার হিন্দু -মুসলমানদের মধ্যে এক মহামিলনমেলা দেখা যায়। শাহ আরেফিন (র.) অনেকের কাছে জিন্দাপীর হিসেবে পরিচতি। প্রতি বছর ওরস মোবারককে কেন্দ্র করে ভক্ত আশেকানের সমাগমে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ওরস মোবারক। সাধারণ দর্শনার্থীরা আসেন শাহ আরেফিনের স্মৃতি বিজড়িত বাংলাদেশ আস্তানায় এবং সেখান থেকেই একবার চোখ দিয়ে পরখ করে নেন অদূরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে অবস্থিত শাহ আরেফিনের আস্তানার স্মৃতি চিহ্নের দিকে। কেউ আসেন মানত নিয়ে, আবার কেউ দোয়া নেন, কেউবা মোকাম জিয়ারত করেন।