জমি বন্দোবস্ত নেবার পায়তারা একটি পক্ষের
বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্বজিত রায়
পাকিস্তান আমলে নদীর এপারে (সাচনা বাজারে) সরকারি হাসপাতাল বলতে সাচনা বাজার স্বাস্থ্যকেন্দ্রই ছিল। ডাক্তার, কম্পাউন্ডার ও একজন চতুর্থ শ্রেণির স্টাফ এখানে থাকতেন। জ¦র, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ ছোট খাটো রোগ বালাইয়ে বোতল সঙ্গে নিয়ে আসতেন রোগীরা। ওষুধ বলতে বোতলে ‘মিকচার’ পানিয় দেওয়া হত, কাগজে দাগ দিয়ে, এই কাগজ বোতলে লাগিয়ে দাগ দিয়ে বলা হত এক দাগ, দুই দাগ খাবেন। জামালগঞ্জের বেহেলী, সাচনা ও উত্তর জামালগঞ্জ ইউনিয়নবাসীর এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রই ছিল ভরসা। আশির দশকে জামালগঞ্জে ৩০ শয্যার হাসপাতাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওইসময় সাচনাবাজারে হাসপাতাল কমপ্লেক্সের জন্য উপযুক্ত জমি পাওয়া যায় নি। পরে ওপারে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয় এবং ১৯৮৫ সালে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপরও কিছুদিন এখানে (সাচনা বাজারে) স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু ছিল। একপর্যায়ে ডাক্তার কর্মচারী সংকটে এখানকার স্বাস্থ্য কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন সুরমা নদীর সাচনা পাড়ের বেহেলী, জামালগঞ্জ উত্তর ও সাচনা ইউনিয়নবাসী চিকিৎসা সংকটে আছেন। বিশেষ করে গভীর রাতে কোন গর্ভবর্তী মায়ের প্রসব বেদনা হলে কিংবা অসুস্থ বোধ করলে সমস্যায় পড়তে হয়। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সকলের সঙ্গেই কথা বলেছি। কিন্তু কোন কাজ হয় নি। মৃত্যুর আগে পরিত্যক্ত হাসপাতালটি আবার চালু দেখে যেতে চাই, আপনারা একটু সহায়তা করুণ ভাই।
সাচনা বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ৭০ বছর বয়সি ব্যবসায়ী চিত্ত রঞ্জন পাল’র আকুতি এটি।
কেবল চিত্ত রঞ্জন পাল নয়, স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ট সাচনা চৌধুরী বাড়ির অমল কান্তি ঘোষ চৌধুরী (৮৮), একই গ্রামের মন্তোষ সরকার (৭৬) এবং সাচনা গ্রামের ৮৪ বছর বয়সী মো. আব্দুল কুদ্দুছও মৃত্যুর আগে এলাকার বন্ধ হওয়া স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু দেখতে চান।
সম্প্রতি, জেলার নদীবন্দর হিসেবে খ্যাত সাচনা বাজারের কাঁচামাল পট্টির পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনসেড পুরোনো ঘরের বেহাল অবস্থা। ছালের টিন ভেঙে পড়ছে. ভেতরে বাসা বেঁধেছে পতঙ্গ চামচিকেরা। প্রাচীনতার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নির্জীব এই অবকাঠামোর কাছে ঘেঁষলে অনুভব করা যায়- রক্ষার নীরব আকুতি। সেবা আর ঐতিহ্যে গর্বিত স্থাপনাটি একসময় বহু মানুষের রোগমুক্তিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে সে নিজেই রোগাক্রান্ত হয়ে বেঁচে থাকার আকুতি জানাচ্ছে।
জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের শহীদ মিনার সংলগ্ন পুরোনো হাসপাতালটি বর্তমানে দূষণ ও দখলের শিকার হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত হয়েছে। সর্বাবস্থায় বিপন্ন শতবর্ষী এ হাসপাতালটি দেশবরেণ্য রাজনীতিক প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম হয়েছে এমন জনশ্রুতিও আছে এখানে।
সুরমায় পৃথক হওয়া উপজেলার প্রায় অর্ধেকে বিস্তৃত সাচনা বাজার অংশের জরুরী স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে পুরোনো জরাজীর্ণ এ হাসপাতালটিকে সংস্কার করে অন্ততঃ ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল করার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার কামলাবাজ মৌজার জেএল নং-১৮, ৭৪৮৬নং দাগে ৪৬ শতক ভূমির উপর স্থাপিত পুরাতন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বারবার অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়েছে। অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় সেটি অবৈধ দখলমুক্ত করে সীমানা প্রাচীর দেওয়া হয়েছিল। তারপরও দখল ও দূষণমুক্ত হতে পারছে না শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই হাসপাতালটি। বর্তমানে একটি চক্র হাসপাতালের এই জায়গাটি বন্দোবস্ত নিয়ে দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই অপতৎপরতা প্রতিরোধ করে সেখানে পুনঃরায় হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক, সে দাবি সকলের।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, সাচনা বাজারের পুরোনো এই হাসপাতালটি ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পুরো উপজেলায় ঐ একটিমাত্র চিকিৎসালয়ই তখন ছিল। তৎকালীন সময়ে জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুরূহ থাকায় মানুষের রোগমুক্তির অন্যতম ভরসাস্থল ছিল সেটি। সেখানে একজন এলএমএফ ডাক্তার ও দুইজন কম্পাউন্ডারসহ ৩ জন ডক্তার কর্মচারী চিকিৎসা সেবা পরিচালনা করতেন। স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ডা. শামসুল ইসলাম চৌধুরী (পাগলা ডাক্তার হিসেবে খ্যাত), ডা. মতিলাল সিনহা, ডা. গ্রীষ্পতি নন্দন চৌধুরী, ডা. রইছ উদ্দিন, ডা. আহমদ হোসেন ও ডা. আকমল হোসেন এ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে কম্পাউন্ডার হিসেবে গোপেন্দ্র কুমার আচার্য্য, কার্তিক দাস ও ক্ষীরদ মোহন রায়ের নাম এখন মুখে মুখে আছে এলাকাবাসীর।
বাজারের ব্যবসায়ী স্বপন রায় বললেন, আমাদের বহুদিনের আকুতি হাসপাতালটি পুনরায় চালু করার। এটি চালু হলে লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হবে।
হাসপাতালের একসময়ের কম্পাউন্ডার প্রয়াত গোপেন্দ্র কুমার আচার্যীর ছেলে সমরেন্দ্র আচার্য্য শম্ভু বললেন, ১৯৪৯ সালে সাচনা বাজারের এই হাসপাতালটিতে চাকুরি করেছেন তার বাবা। তিনি বললেন, জামালগঞ্জ উপজেলার তিন ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে নিশ্চয়ই আন্তরিক হবেন সরকারের দায়িত্বশীলরা।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বললেন, ‘আমার বাবা প্রয়াত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আল আজাদ বন্ধ হওয়া এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর চেষ্টা করে গেছেন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দৌড়গড়ায় পৌঁছানোর জন্যই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু এখন সময়ের দাবি। আমরা চেষ্টা করছি। সকলে সহযোগিতা করলে দ্রুতই এটি চালু হবে আশা করছি।
জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মঈন উদ্দিন আলমগীর বললেন, আমরাও চাচ্ছি ওখানে একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু হোক। অবকাঠামো মেরামত করে একজন ডাক্তার, একজন সেবিকা ও দুইজন স্টাফ নিয়োগ দিলেই এখানে ডেলিভারী সর্ভিস ও বর্হিঃবিভাগ চালু করা যায়।
সিভিল সার্জন ডা. আহমেদ হোসেন বললেন, গত সপ্তাহে সাচনাবাজার ঘুরে এসেছেন তিনি। ওখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র’র মত ছোট স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র চালু করার পক্ষে তিনিও। এজন্য উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নিয়ে বসবেন তাঁরা। সকলের মতামত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
- লায়েক মিয়ার হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল
- তাহিরপুরে ভারতীয় কয়লা, চিনিসহ স্টিলবডি নৌকা জব্দ


