টিসিবি’র পণ্য কার্ডধারী ছাড়া অন্য কারও নিকট বিক্রি বন্ধ হোক

সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে নির্ধারিত পণ্য বিক্রির যে কার্যক্রম শুরু করেছেন তাতে অনেক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালার অপব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জেলার টিসিবি পণ্য বিক্রি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে এমন তথ্য উঠে এসেছে। পবিত্র রমজান মাসের জন্য প্রতি কার্ডধারী পরিবারকে ৪৭০ টাকার বিনিময়ে দুই কেজি ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও দুই লিটার সুয়াবিন তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। সারা দেশে এক কোটি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়। সুনামগঞ্জ জেলায় কার্ডধারী পরিবারের সংখ্যা এক লাখ ১৪ হাজার ৯১০ জন। এই কার্ডধারীদের মধ্যেই পণ্য বিতরণ করা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু জানা যায় বহু কার্ডধারী টিসিবির পণ্য কিনতে এসে মালামাল না থাকার কারণে বিফল হয়ে ফিরে যান। এই কার্ডধারীরা নিজেদের অবস্থানস্থল থেকে ডিলার পয়েন্ট পর্যন্ত বেশ যাতায়াত খরচ করে আসেন। এছাড়া তাঁদের একটি শ্রমদিবসও অপচয় হয়। সুতরাং যারা পণ্য খরিদ করতে এসে পান না তাদের ক্ষতি সহজেই অনুমেয়। টিসিবি ডিলাররা নির্ধারিত কার্ডধারী ছাড়াও স্থানীয় জনরপ্রতিনিধিদের স্লিপ অনুসারে কার্ডবিহীন ব্যক্তিদের নিকট পণ্য বিক্রি করেন বলে সংবাদ থেকে জানা যায়। যেহেতু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ অনুসারেই উপকারভোগী চিহ্নিত করা হয়েছে সেহেতু কার্ডবিহীন ব্যক্তির নিকট পণ্য বিক্রি করা সমীচীন নয় বলে আমরা মনে করি। অথচ বাস্তবে এটিই ঘটছে। এই দ্বৈত পদ্ধতির কারণেই অনিয়ম হচ্ছে বলে ধারণা করা অসঙ্গত নয়।
টিসিবি প্রধান কার্যালয় থেকে গত ১ মার্চ ১৭৪ নম্বর স্মারকমূলে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির নীতিমালা জারি করা হয়। ওই পত্রের (ঙ) নং অনুচ্ছেদে অনুমোদিত ফ্যামিলি কার্ড/স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পণ্য বিক্রির নির্দেশনা দেয়া হয়। আমাদের কাছে মনে হয় নীতিমালার এই ধারাটি পরষ্পর বিরোধী ও বিভ্রান্তিকর। যেহেতু যোগ্যতা যাচাই করে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে সেহেতু ‘স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক’ পণ্য বিক্রি করার শর্ত যুক্ত করার কারণে কার্ডধারী ছাড়া অন্য ব্যক্তির নিকট পণ্য বিক্রির মতো যথেচ্ছাচার সম্ভব হচ্ছে। এই ধারাটি বাতিল করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি। এতে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ও জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের লোকজনের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই দ্বৈত ব্যবস্থা বহাল রেখে টিসিবির পণ্য বিক্রয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে।
প্রত্যেক ডিলারকে একটি নির্ধারিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা আবশ্যক। ডিলাররা কী প্রক্রিয়ায় পণ্য বিক্রির হিসাব রাখেন আমরা জানি না। তবে প্রতিদিনের বিক্রির হিসাব রাখার রেজিস্টারে ক্রেতার নাম, ঠিকানা ও কার্ড নম্বর ইত্যাদি তথ্য সংরক্ষণ ও তদারকি কর্মকর্তা কর্তৃক তা নিয়মিত যাচাই করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। আমাদের দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী কালে যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু ছিলো সেখানে ডিলাররা নির্দিষ্ট ঘরে পণ্য মজুদ ও বিক্রি করতেন এবং এর সুষ্ঠু হিসাব সংরক্ষণ করে সরকারের নিকট দাখিল করতেন। টিসিবি’র ক্ষেত্রেও এই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এছাড়া রেশনিং ব্যবস্থাটিকে স্থায়ী করা প্রয়োজন। কারণ প্রান্তিক পরিবারগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার বাস্তবতা এখনও বিদ্যমান এবং সহসা এই বাস্তবতা নিরসনের কোনো সম্ভাবনা নেই। সাধারণ মানুষের স্বার্থে রেশনিং ব্যবস্থার প্রচলন করা আশু প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদে জেলা প্রশাসক বলেছেন, বিক্রির সর্বশেষ সময় পর্যন্ত ডিলারদের কার্ডধারীদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে । তাঁর কথার সারমর্ম হলোÑ কার্ডধারীরাই এই পণ্য পাওয়ার প্রকৃত হকদার। এদের বঞ্চিত করার মতো অমানবিকতা কাম্য নয়। আশা করি, জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের ইচ্ছামতো কার্ডধারীদের বঞ্চিত করতে ইচ্ছামাফিক কোনো তালিকা ডিলারদের নিকট পাঠানো থেকে বিরত থাকবেন।