তাহিরপুরে নৌপথে চাঁদাবাজি/ নদীর ১০ কিলোমিটার যেতে চাঁদা ২০ হাজার টাকা

সাঈদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের তিন শুল্ক স্টেশন বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলি দিয়ে আসা কয়লা পরিবহনের সময় নদীপথে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ডাম্পের বাজার থেকে সুলেমানপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার পথ যেতে দফায় দফায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা গুনতে হয় চালকদের। উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন, যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহমদ, উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিআইডব্লিউএ এর ইজারাদারের বিরুদ্ধে এই চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে। চাঁদা না দিলে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিদিন শতাধিক কয়লা, চুনাপাথর বুঝাই বাল্কহেড ও নৌকা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায় পাটলাই নদী হয়ে। সীমান্তের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ডাম্পের বাজার থেকে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সুলেমানপুর বাজার পর্যন্ত আসতে একাধিক জায়গায় পণ্যবাহী নৌ চালকদের মোটা অংকের চাঁদা গুনতে হয়। চাঁদাবাজদের চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা না দিলে শারীরিক নির্যাতনেরও অভিযোগ আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা প্রশাসন থেকে উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর বাজার ঘাটের ইজারা এনেছেন উপজেলা যুব লীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন ও ডাম্পের বাজার ঘাট ইজারা এনেছেন উপজেলা যুব দলের যুগ্ম আহবায়ক আলী আহমদ।
নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকায় বাল্কহেড (বড় নৌকা) থেকে সর্বোচ্চ ৯৫০ টাকা তুলার কথা থাকলেও এসব তুয়াক্কা করছেন না তারা। ইউনিয়ন পরিষদের কর তফসিল ২০১৩ দেখিয়েও চেয়ারম্যান নিজস্ব লোক দিয়ে চাঁদা আদায় করছেন। এছাড়াও নদীতে বিআইডব্লিউটি এর ইজারাদারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। চার জায়গায় প্রতি নৌ-যান থেকে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ’এর (বিআইডব্লিউএ) আদায়যোগ্য শুল্ক হার থেকে জানা যায়, ৫০ টনের নৌকা ১২৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টনের উপরে বুঝাই নৌকা থেকে ১৬৯০ টাকা আদায় করতে পারবে। তবে এই এলাকায় এখন শুষ্কু মৌসুমে সর্বোচ্চ ২৫০ টন বহনকারী নৌকা চলাচল করতে পারে। আর বর্ষাকালে ৫০০ টনের বেশি বহনকারী বড় নৌকা চলাচলা করতে পারে না।
মুন্সিগঞ্জের নৌকা চালক মো. আরিফ বললেন, উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের বৈঠাকালি ঘাট থেকে ১১০ টন কয়লা নিয়ে ভৈরব যাচ্ছিলাম। ঘাট থেকে সুলেমানপুর পর্যন্ত বিআইডব্লিউএ, দুই কোটগাড়ি (ইজারা পয়েন্ট) ও ইউনিয়নের প্রতিনিধিকে প্রায় ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। দূরের নৌকা দেখলে তারা চাঁদার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয়। স্থানীয় নৌকার কাছ থেকে যদি পাঁচ হাজার করে রাখে, তাহলে আমাদের কাছ থেকে রাখে সাত থেকে আট হাজার টাকা। টাকা কম দিতে গেলে শারীরিক নির্যাতনও করে তারা।
কলমাকান্দার নৌকা চালক মো. সুখেদ মিয়া বললেন, ৯৭ টন কয়লা নিয়ে ভৈরব যাচ্ছি। এজন্য বড়ছড়া পয়েন্টে কোটগাড়িতে দিতে হয়েছে তিন হাজার, ছাড়াগাও পয়েন্টের কোটগাড়িকে দেয়া লাগে পাঁচ হাজার টাকা। বড় নৌকা থেকে ছয় থেকে সাত হাজার টাকাও নিচ্ছে তারা।
তাহিরপুরের জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা নৌ-চালক সালমান আহমেদ বললেন, আমি চুনাপাথর নিয়ে ভৈরব যাচ্ছি। ডাম্পের বাজার থেকে সুলেমানপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশে চাঁদা দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত। আমরা এই চাঁদা বন্ধের দাবি জানাই।
ডাম্পের বাজার ঘাট ইজারাদার উপজেলা যুব দলের যুগ্ম আহবায়ক আলী আহমদ বলেন, বড় বলগেট (বাল্কহেড) থেকে আমরা সর্বোচ্চ ১২শ’ টাকা আদায় করি। ছোট নৌকা থেকে আরও কম আদায় করা হয়। অতিরিক্ত টাকা কারও কাছ থেকে আদায় করা হয় না।
উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন বললেন, আমাদের ইজরা মেয়াদ আর তিন চারদিন রয়েছে। আমরা ওখান থেকে ওঠে এসেছি। স্থানীয় শ্রমিকদের দায়িত্ব দিয়ে এসেছি। তারা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী টাকা রাখছে বলে জানা আমার। আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো, নির্ধারিত টোলের বেশি যাতে কেউ আদায় করতে পারে না, সেটি খেওয়াল রাখবো।
বিআইডব্লিউএ এর ইজারাদার মুর্শেদ আলম বলেন, আমরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করি না। সরকারি তালিকা অনুযায়ী টাকা আদায় করা হয়।
উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হায়দার বললেন, আমার ইউনিয়নে তিনটি শুল্ক স্টেশন রয়েছে। এই স্টেশনগুলো দিয়ে পাথর ও কয়লা আমদানী হয়ে নৌপথে সারাদেশে রপ্তানি হয়। আমরা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বড় নৌকা থেকে দেড়শ’ টাকা ও ছোট নৌকা থেকে একশ’ টাকা উত্তোলন করছি। তিনি বলেন, পরিষদের সদস্যদের সম্মানি ও উন্নয়ন খাতে এই টাকা ব্যয় হয়।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ্ বললেন, ইজারাদারদের সরকারি রেটের উপরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের সুযোগ নেই। এনিয়ে কেউ অভিযোগ করেন নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়াও নিয়মিত পুলিশের টহল থাকে ঐ এলাকায়।