জামালগঞ্জে ভিজিডি কার্ডে উৎকোচ গ্রহণ/ জনসেবার পরিবর্তে এই জনপীড়ন কবে বন্ধ হবে?

জামালগঞ্জ উপজেলায় ভিজিডি কার্ড বিতরণের সময় অবৈধ টাকা নেয়ার দুইটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। ১৫ এপ্রিলের পত্রিকায় জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য রিয়াশত আলী কর্তৃক কয়েকজন উপকারভোগীকে কার্ড পাইয়ে দেয়ার নামে ৫ হাজার টাকা করে উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ করেছেন ভোক্তভোগীরা। ওই ইউপি সদস্য টাকা নিয়েও ভিজিডি কার্ড দেননি। ওই সদস্যের বিরুদ্ধে দুইটি অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। ভোক্তাভোগীরা কার্ড না পাওয়ায় উৎকোচের টাকা ফেরত চাইলে তাদের হুমকি দেয়া হয়। ১৭ এপ্রিলের অপর এক সংবাদভাষ্য অনুসারে জানা যায়, ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য জন্টু তালুকদার অনেকের নিকট থেকে এই কার্ড বরাদ্দ দানের কথা বলে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখানেও যারা টাকা দিয়েছেন তাদের অনেকে কার্ড পাননি। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এইসব অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং তদন্তস্বাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের গতানুগতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উপরের দুই ঘটনা সরকারের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কী ধরনের অবস্থা চলছে তার একটি নমুনা। বহুক্ষেত্রে এমন দুর্নীতির খবর সংবাদপত্র পর্যন্ত আসে না। অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে চান না। ইউনিয়ন পরিষদে যারা চেয়ারম্যান বা সদস্য নির্বাচিত হন তারা স্থানীয়ভাবে খুবই প্রভাবশালী ও চতুর হয়ে থাকেন। এদের দাপটের কাছে সাধারণ মানুষ অসহায় থাকেন। যারা টাকা দিয়ে কার্ড পেয়ে যান তারা আর এ সম্পর্কে অভিযোগ করেন না। তারা এই দুর্নীতিকে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর অপরিহার্য বাস্তবতা বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে অধিকাংশ দুর্নীতি ঘটনাগুলোই অপ্রকাশিত থেকে যায়। মাঠ পর্যায়ের এমন দুরবস্থা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার জন্য যথেষ্ট। যারা দুর্নীতির শিকার তারা হয়তো প্রকাশ্যে কিছু বলেন না কিন্তু মনে মনে তো জড়িত ব্যক্তি ও সরকারের প্রতিই অসন্তুষ্ট হন। আমাদের প্রশ্ন সরকারের দারিদ্রবিমোচনমূলক কর্মসূচিগুলো নিয়ে মাঠের এই দুর্নীতিচক্র উচ্ছেদে কেন শক্ত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না?
ভিডব্লিউবি বা ভিজিডি উভয় কার্ডই সমাজের সবচাইতে পশ্চাদপদ বা দুর্বল শ্রেণির জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্র্তৃক উপকারভোগী বাছাই করে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। উপকারভোগী বাছাইয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের তালিকা অনুসরণ করা হয়। পদ্ধতিতে কোনো ত্রুটি নেই। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এলাকার সবচাইতে প্রান্তিক ব্যক্তিদেরই এই সুবিধা পাওয়ার কথা। কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীরা প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল সহায়তা পেতে থাকেন টানা দুই বছর ধরে। দুই বছরের একটি চক্র শেষ হলে নতুন চক্রের জন্য ভিন্ন সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়। সুবিধাভোগী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপতিনিধিদের আর্থিক উৎকোচ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, স্বচ্ছল ব্যক্তিদের তালিকাভুক্তি প্রভৃতি অভিযোগ নিয়মিত শোনা যায়। সমস্যা হচ্ছে, এইসব অনিয়ম যাদের নিয়ন্ত্রণ ও দমন করার কথা তারাও কোনো না কোনো ভাবে এইসব অনৈতিকতাকে হয় উপেক্ষা করেন নয় প্রশ্রয় দেন অথবা গুরুত্ব কম দেন। একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এমন অপকর্ম নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, এইসব অভিযোগের অগ্রভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নাম চলে আসে। অথচ তাঁদেরই এইসব অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে প্রকৃত দরিদ্র ব্যক্তিদের সহায়তা দিয়ে নির্বাচনী ‘জনসেবা’র প্রতিশ্রুতি পালন করা উচিৎ ছিলো। জনসেবার পরিবর্তে এই জনপীড়ন জনগণের প্রতি তাঁদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও চরম পরিহাসের নামান্তর। জনগণকে এইসব অপকীর্তিসম্পন্ন জনপ্রতিনিধিদের বয়কট করা উচিৎ।
জামালগঞ্জে যে দুই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তা আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।