হাওরে চলছে ধান কাটা উৎসব/ কৃষকদের উৎসাহ দিতে আসলেন তিন মন্ত্রী

শান্তিগঞ্জ অফিস
হাওরে চলছে ধান কাটা উৎসব। কৃষকদের উৎসাহ দিতে সুনামগঞ্জের ধান কাটা উৎসবে এসে যোগ দিলেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এমপি, পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম এমপি। বেলা সাড়ে ১১ টায় বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতায় দেখার হাওরের তেছারকোণা অংশে সনাতনী ও হারভেস্টার যন্ত্র দুইভাবেই ধান কাটলেন তারা। পরে এই উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দিলেন মন্ত্রীরা।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে হাওরে। দ্রুত ধান কাটার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন লাখো কৃষক। কেউ হারভেস্টার যন্ত্রে, কেউ বা ধান কাটার যন্ত্রে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ২৩ এপ্রিলের মধ্যে ধান কাটার তাগাদা দেওয়ায় কৃষকদের এমন প্রাণান্তকরণ চেষ্টা। এই পরিস্থিতিতে বুধবার সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে একসঙ্গে সরকারের তিন মন্ত্রী এসে কৃষকদের উৎসাহ দেবার চেষ্টা করলেন।
কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে গণমাধ্যমকে এসময় বললেন, সকলের মুখে হাসি, ধান ঘরে তুলা নিয়ে অন্যান্য বছর যে দুশ্চিন্তা থাকতো, এবার সেটি নেই। অনেক বছর কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারে না। এবার সুনামগঞ্জে এসে ভালো লাগছে, ইনশাল্লাহ মনে হয় ধান কাটা যাবে। প্রায় ৩০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। যে বছর ধান হয়, সারা বাংলাদেশে সুনামগঞ্জের ধান চলে যায়। সারাদেশের মানুষ খেতে পারে। আর যে বছর হাওরে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয় সারা দেশে এর প্রভাব পড়ে। এটা আমার নিজের অভিজ্ঞতা, আমি নিজে খাদ্যমন্ত্রী ছিলাম। আমাকে বলেছিল, এবার হাওরে ধান হয় নাই আপনার খাদ্য সংকট হবে। আমি দেখলাম সাত/আট মাস পর ঠিকই খাদ্য সংকট হলো। হু হু করে অগ্রহায়ন মাসে চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে এক হাজার কম্বাইন হারভেস্টার এই মুহূর্তে ধান কাটছে। গত বছর আমরা ৩০ তারিখের মধ্যে পুরো ধান কেটেছিলাম। এ বছর আমরা আশা করছি তার আগেই কেটে ফেলবো। আমার দৃঢ় বিশ^াস এবছর আমাদের তেমন ক্ষতি হবে না। এবছর ধানও ভালো হয়েছে। আমরা সব সময়ই বলি বাংলা মায়ের হাসি ধানের শীষে। আজকে হাওরে এসে সকল কৃষকের মুখে, সকল মানুষের মুখে আমি হাসি দেখলাম। এটিই আমার কাছে ভালো লাগার বিষয়। আমরা যেনো ঘরে ধান তুলতে পারি সেজন্য আসুন আল্লার দরবারে সবাই দোয়া করি।
পরে জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী’র সভাপতিত্বে এই উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিন মন্ত্রী, সচিব, কৃষি বিভাগের উর্ধ্বতনরাসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে ধান কেনার ঘোষণা দিয়ে বললেন, যত খুশী ধান দিতে পারবেন কৃষক। বর্তমান সরকারের নানা সাফল্য তুলে ধরে তিনি বললেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গেল ১৪ বছরে দেশে একজন মানুষও না খেয়ে মরে নি।
বিএনপি’র জ্বালাও পোড়াওয়ের নানা ঘটনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসুক না আসুক, এটা তাদের ব্যাপার। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েও তারা সেটি যাচাই করতে পারতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অযৌক্তিক আন্দোলনের নামে দেশে অরাজকতা করতে চায় বিএনপি। আমরা পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে কোনো সরকার নেই, পবিত্র সংবিধান অনুযায়ী এই সরকারের অধীনেই দেশে নির্বাচন বাস্তবায়ন করবে নির্বাচন কমিশন। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সবাই ভোট দিবে, ভোটের মাধ্যমে জনগণ নির্ধারণ করবেন কারা দেশ পরিচালনা করবে। যদি জনগণ আপনাদের বেচে নেয়, তাদের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা ঘরে ফিরে যাবো। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আসন্ন। এতেও বিএনপি আসতে চায় না। কিসের এতো ভয়? এসে পরীক্ষা করেন, দেখেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয় কি না? আমরা তো প্রার্থী বদলিয়ে যে পাশ করবে, তাকে নমিনেশন দিয়েছি। আপনারাও যোগ্য ব্যক্তিকে দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন।
পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি নিজেকে কৃষকের সন্তান পরিচয় দিয়ে শৈশবের স্মৃতিচারণ করলেন। বললেন, মধ্যস্বত্বভোগী নয়, কৃষকের কাছ থেকেই ধান কেনা হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, সুনামগঞ্জে উন্নত মানের অনেক ধান উৎপাদন হয়। মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়। আমরা মনে করি কৃষিই আমাদের মূল চালিকা শক্তি। তাই, সোনার এ ফসল রক্ষার জন্য আমরা অনেক চেষ্টা করি। হাওরে বাঁধ দেই। খাল খনন করি। ধান ঘরে তোলার আগে পর্যন্ত আমাদের কপালে দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ থাকে। প্রতি বছর এই ফসল রক্ষায় সরকার শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। যা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সরকার কৃষক ভাইদের সহযোগিতায় কৃষিতে বিপ্লব করতে চায়।


পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, হাওররক্ষা বাঁধের কাজ ও বরাদ্দ নিয়ে কথা ওঠে। এবার বাঁধের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল ২৩০ কোটি টাকা, আমরা ১০০ কোটি টাকা দিয়েছি। পিআইসিদের (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে) আর ৩০ কোটি টাকার বেশি দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বললেন, সাংবাদিকদের কাছ থেকে পাওয়া পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হবে।
বিরোধী দলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ এমপি বলেন, হাওরে বরাদ্দ দেবার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ এবং অতিরিক্ত বরাদ্দে সরকারের অর্থের অপচয় হয়। বরাদ্দের অর্থ যেন লুটপাট না হয় সেটি খেয়াল রাখতে হবে।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক জাকির হোসেন ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ছকিনা আক্তারের সঞ্চালনায় বোর ধান কর্তন উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম, সুনামগঞ্জ- ৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুল হক মিসবাহ।
অন্যান্যদের মধে বক্তব্য রাখেন পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের সচিব নাজমুল আহসান, বাংলাদেশ কৃষকলীগের সহ-সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী, কৃষি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ্ সাজ্জাদ ও পুলিশ সুপার এহসান শাহ্, ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত সুজন, স্থানীয় কৃষক আব্দুল গণি প্রমুখ।