# কলেজে অনার্স কোর্সে সুফল কম
# প্রতি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল হবে
সজীব দে
শিক্ষা মৌলিক মানবাধিকার এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু সুনামগঞ্জ জেলার শিক্ষার অবস্থা একেবারেই বেহাল। এটা শুধু প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা না, নেতৃত্ব দূরদর্শিতা, সক্ষমতা এবং আবেগ-বুদ্ধিমত্তা এবং নৈতিকতাও এখানে বড় প্রশ্ন। হাওর জনপদে শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা, এমনকি অনেকে মৌলিক শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত। হাওর এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা বা কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ পাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনান প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতীয় গড় থেকে সবচেয়ে কম সাক্ষরতার হারের পাচঁটি জেলার একটি সুনামগঞ্জ। সিলেট বিভাগের চারটি জেলার মধ্যেও সবচেয়ে কম সাক্ষরতার হার সুনামগঞ্জে। সিলেটের প্রাথমিক স্কুলে নিট গমন হার দেশের গড় হারের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কম। সারা দেশের মধ্যে ঝরে পড়ার হার সুনামগঞ্জে সর্বাধিক। তবে এই প্রতিকূল পরিবেশ থেকেও অনেকেই সুনাম কুড়িয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তারা।
‘হাওর এলাকায় শিক্ষার বাস্তবতা: ও সুনামগঞ্জের গল্প’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য ওঠে আসে। মঙ্গলবার বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরীর আয়োজনে লাইব্রেরী মিলনায়তনে এই সেমিনার হয়।
পাঠাগারের সভাপতি ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ- ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় হুইপ অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ এর ফ্যাকাল্টি অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার। সেমিনারে বিশেষ আলোচক ছিলেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক রজত কান্তি সোম ।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. খলিল রহমান এর সঞ্চালনায় সেমিনারে বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে, সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মোনাওয়ার আলী, সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈয়বুর রহমান বাবুল, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত, সুনামগঞ্জ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি আশহার ইনতেযাম তাহবির।
সেমিনারে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট চান মিয়া, অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার দাশ রায়, সাংবাদিক বিজন সেন রায়, জেলা সিপিবির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ, লেখক ও গবেষক অ্যাডভোকট কল্লোল তালুকদার, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব নাজির আহমেদ চৌধুরী, ডা. মুর্শেদ আলম, দিগেন্দ্র বর্মন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক (ইংরেজী) মশিউর রহমান, জেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হারুন রশিদ, শিক্ষক নাসরিন আক্তার, আব্দুস সাত্তার, শরিফা আশ্রাফি সম্পা প্রমুখ।
সেমিনারে শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন, আমি রাজগোবিন্দ স্কুলে যখন পড়ি- তখন দেখেছি খালি পায়ে, চটি জুতা পায়ে দিয়ে, ছেঁড়া পাঞ্জাবী গায়ে দিয়েও শিক্ষকরা পড়িয়েছেন। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী ও সুনামগঞ্জ কলেজে তখন পড়া হয়েছে। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু পড়াশোনার মান কমে গেছে।
তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ের কল্যাণে সব কলেজে অনার্স কোর্স খোলা হয়েছে। কিন্তু অনার্স কিংবা মাস্টার্স পর্যায়ে কলেজে যেতে হয় না। বাসায় বসে বসে অনার্স এবং মাস্টার্স পরীক্ষা দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষার মান নিচের দিকে যাচ্ছে।
আমাদের শিক্ষক সংকট দূর করা দরকার। এছাড়াও বিদ্যমান যে শিক্ষকরা আছেন- আমি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি অনেকেই ক্লাস নেন না। কলেজে বসে থাকেন স্টাফ রুমে, এটা আমার দেখা। কিছু নীতিবান শিক্ষক আছেন যারা ক্লাসে যান। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স মস্টার্স পর্যায়ে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে অনন্তত ১০ জন করে শিক্ষক দরকার। শিক্ষকরা যাতে নিয়মিত ভাবে ক্লাস নেন, ছাত্ররাও যাতে নিয়মিত ভাবে উপস্থিত থাকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। পাঠদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ আমরা দেখেছি- স্কুল-কলেজ বন্ধ, কিন্তু প্রাইভেট টিউশনি ব্যাপক ভাবে চলছে।
আর করোনা পরিস্থিতি বা অন্যান্য কারণে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে ৫০ মার্কের, বিনা পরীক্ষায় পাশ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও উত্তরপত্র মূল্যায়নেও বোর্ড কর্তৃক কার থেকে কে বেশী দিতে পারেন প্রতিযোগিতা হয়েছে। ৯৭% পাশ করতে পারে কোন পরীক্ষায়? কিন্তু এখন করে। এসব বিষয়ে নীতি নির্ধারনী এবং স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার দরকার।
তিনি জেলা প্রশাসকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনি সংসদ সদস্য, শিক্ষকদের নিয়ে বসুন। কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা যায়, শিক্ষার্থীদের ক্লাস রুমে ফিরিয়ে আনা যায়, প্রাইভেট পড়ানো কমিয়ে দেয়া যায়, এসব নিয়ে আমরা আলোচনা করি। তাহলে শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে বলে আমি মনে করি।
সুনামগঞ্জ জেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হারুন রশিদ বলেন, হাওরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য আলাদা ক্যালেন্ডার করা দরকার। এখন সুনামগঞ্জে ধান কাটার উৎসব চলছে, শিশুরাও পিতা-মাতাকে সাহায্য করতে মাঠে কাজ করছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আসছে না। আগামী মে মাসে আবার আমাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যদি হাওরাঞ্চলে এপ্রিলে নিয়ে আসা যায় তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন হবে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক রজত কান্তি সোম বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে হাওর উন্নয়ন বোর্ড করার প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে সেই বোর্ড গৃহীত হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালে সামরিক সরকার সেটি রদ করে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ২০০০ সালে এই বোর্ড আবার যাত্রা শুরু করে। ২০১২ সালে হাওরাঞ্চলের জন্য এই বোর্ড ২০ বছরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা চলমান রয়েছে। এটা হলে শিক্ষা স্বাস্থ্য সহ আমাদের মৌলিক দাবি পূরণ হবে।
সুনামগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় হুইপ অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, শিক্ষার উন্নয়ন হচ্ছে। আমার সময়কালে আমার নির্বাচনী এলাকাতে ৫৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করে দিয়েছি। জয়নগর স্কুলে একটি ছেলেদের হোস্টেল, একটি মেয়েদের হোস্টেল ও একটি চারতলা মাল্টিপারপার সেন্টারের কাজ চলমান রয়েছে। গৌরারং ইউনিয়নের ইসলামগঞ্জ কলেজে ১০০ রুমের ছেলেদের হোস্টেল, মেয়েদের হোস্টেল ও একটি চারতলা মাল্টিপারপাস ভবনের কাজ শুরু হয়েছে। হাওর এলাকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবাসিক শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। সাত বছর আগে ফতেপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও স্কুলে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব করে তথ্য প্রযুক্তি গ্রামের ভেতরে পৌঁছে দিয়েছি।
তিনি বলেন, দশম জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যেসব উপজেলায় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, সেখানে একটা করে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বম্ভরপুর দিগেন্দ্র বর্মন কলেজ ও বিশ্বম্ভরপুর মডেল উচ্চ বিদ্যালয় সরকারিকরণ হয়েছে। হাওর এলাকায় শিক্ষক সহ সকল সরকারি কর্মকর্তাদের হাওর ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিদ্যালয় সুন্দর করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্লিপের টাকা দেয়া হচ্ছে। প্রতি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুলও হবে।
কলেজে অনার্স কোর্স আনা ঠিক হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়ে অনার্স পড়েছি, সেখানে একটা ডিপার্টমেন্টের সেমিনারে যে পরিমান বই থাকতো এখন কলেজের পুরো লাইবেরীতে সেই বই নাই। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ৫০ হাজার জার্নাল ছিল। তবে কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি বলেছেন, ‘আমরা এখন আর কলেজে অনার্স দেবো না, মান কমে যাচ্ছে।’
শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে সরকার এক্সপেরিমেন্ট করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কখনও ৫ম শ্রেণিতে পরীক্ষা আছে, কখনও নাই। কখনও ৮ম শ্রেণিতে পরীক্ষা আছে, আবার নাই। কখনও সৃজনশীল, কখনও আবার সৃজনশীল নেই। এখন যেটা আসছে তা শিক্ষকও বুঝেন না, ছাত্রও বুঝে না। সম্প্রতি আমাকে একজন বললেন, এতো পরিমান শিক্ষক কিন্তু আমাদের রিসোর্স পারসন কয়জন আছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতেই তো কয়েক বছর সময় লাগবে। তখন আমি বললাম, যারা স্কুলে যায় তাদের ভবিষ্যত কী হবে। শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে এতো গবেষণা করা ঠিক হয় নি।
তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলের সমস্যা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে ভিন্ন। আমার সন্তানরা কী সমস্যা মোকাবেলা করছে তা আমি জানি। কিন্তু এটার বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাধান কী জানার জন্য এক্সপার্টদের মতামত দরকার। মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবের উদ্যোগে এক্সপার্টদের আমন্ত্রণ জানানো হোক, তারা আমাদের সমস্যা চিহ্নিত করে উত্তোরণের প্রস্তাবনা দিবেন।


