সীমান্তে বেপরোয়া চোরাকারবারি চক্র

বিশেষ প্রতিনিধি
পানির পাইপের ভেতর দিয়ে, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে কাঁটাতারের উপর দিয়ে এবং পাহাড়ি নদী ছড়ায় যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই ¯্রােতে ভেসে সীমান্তের এপারে আসছে গরু মহিষ, মাদক, পেঁয়াজ, চিনিসহ নানা পণ্য। ওপারে যাচ্ছে মাছ, সুপারী, ডাল, ছানা-মটর ইত্যাদি। দোয়ারাবাজার সীমান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে এমন চোরাচালান ব্যবসা। বেপেরোয়া চোরাচালনী চক্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কখনো ম্যানেজ, কখনোবা চোখ ফাঁকি দিয়ে, আবার কোন বিপদ হতে পারে জেনেও এমন কাজ করছে। গেল ছয়মাসে চোরাচালান ঠেকাতে গিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের উপর দুইবার হামলা হয়েছে। শুক্রবার ভোর রাতেও ওই সীমান্তে এক চোরাইপণ্য বহনকারীর মৃত্যু হয়েছে।
সীমান্তের একাধিক বাসিন্দা জানান, দোয়ারাবাজারের ভোগলা সীমান্তের বাগানবাড়ী, বাংলাবাজার সীমান্তের পেকপাড়া, ঝুঁমগাঁও কলোনী, কলাউড়া, রামসারগাঁও, উত্তর-দক্ষিণ কলাউড়া, গিলাতলি, মৌলারপাড়, জাহাঙ্গীরগাঁও, সুনুগাঁও, রাঙাউটি, খুশিপাড়া, বাওয়ালিপাড়া, কিরণপাড়া, নির্ঝরপাড়া ও উত্তর উস্তেংগারগাঁওয়ের অনেকেই সীমান্তে চোরচালানের কাজের সঙ্গে জড়িত। কেউ ব্যবসা করছে, কেউবা বহনকারী।
স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী দক্ষিণ কলাউড়ার শাহজালাল বললেন, রাত গভীর হলেই জমে ওঠে সীমান্ত। কোন সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করে, কখন বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে এসব কাজ।
তিনি জানালেন, শনিবার ভোর রাতে রাবারড্যামের পাশে মৃত্যু হয়েছে আলামিন (২৫) নামের এক তরুণের। সে সম্পর্কে তার ভাতিজা হয়। তারা ধারণা করছেন, ভোর রাতে তার মৃত্যু হয়েছে।
শাহজালাল বললেন, আলামিন চোরাকারবারীদের মালামাল আনা নেওয়ার লোডার (বহনকারী) হিসাবে কাজ করতো। শুক্রবার রাতে ৩০ জনের লোডার দল তারা একসঙ্গে কাজ করেছে। শেষ রাতে ১৫ জন বিদায় নিয়ে এসেছিল। ১৫ জন একসঙ্গে কাজে ছিল। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
দোয়ারাবাজার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি বশির আহমদ বললেন, এখন দিনের বেলায়ও এই সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ নানা ধরণের মাদক নামে। শত শত গরু প্রকাশ্যে দিনেই নিয়ে যায়।
বাংলাবাজার ইউনিয়নের সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেযারম্যান, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন বললেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথা বলে এখানে টাকাও ওঠায় কেউ কেউ। এই টাকা ওঠানো ওয়ালাদের ম্যানেজ করলে চোলাচালানের মালামাল পাচারের বেলায় সড়কপথে কোন সমস্যা হয় না বলে প্রচার করা হয়। বেশিরভাগ চোরাই মালামাল সড়ক পথে ছাতক, দোয়ারা-সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায় বলে জানান তিনি।
তিনি জানালেন, সীমান্তের অনেক স্থানেই কাঁটা তারের বেড়া নেই। এই অংশটুকু ব্যবহার করে চোরাকারবারিা। আবার পানি নিস্কাশনের পাইপ দিয়েও গরু পারা পার হয়, মানুষও যাতায়াত করতে পারে। কাঁটাতারের বেড়ার উপর বাঁশ দিয়ে বিশেষ যন্ত্র তৈরি করে গরু এপারে নামিয়ে দেয় তারা। দুই মাস আগে বড়খালের পাশে আব্দুল খালেক নামের এক ব্যক্তি সীমান্তে আধিপত্য নিয়ে খুন হন বলে শোনা গেছে। এছাড়া গেল ছয় মাস দুইবার চোরাচালান চক্রের সদস্যগণ বিজিবি’র উপর হামলা করেছে। সীমান্ত আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষও হয়েছে।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি দেব দুলাল ধর বললেন, সীমান্তে আলামিন নামের এক যুবকের লাশ শনিবার সকালে পাওয়া গেছে। সে ওয়ার্কসপে কাজ করতো বলে অনেকে জানিয়েছেন। তার মৃতদেহের পাশে কিছু শিং মাছ পাওয়া গেছে। পুলিশের নামে ওখানে কেউ টাকা তোলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি। প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকার আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত পুলিশের পক্ষ থেকে কাউন্সিলিং করা হচ্ছে। গেল ছয় মাসে ওখানে দুইবার বিজিবির উপর হামলার কথা স্বীকার করেন তিনি। তিনি জানালেন, দুই ঘটনায়ই থানায় মামলা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল মাহবুবুর রহমান বললেন, সীমান্তের কিছু মানুষ অসহিষ্ণু, জীবনের ঝুঁকি এসব কাজ করছে তারা। জীবনহানি ঘটতে পারে জেনেও এমন কাজ নামে এরা। এই পরিস্থিতিতে সকলের শুভবুদ্ধির উদয় জরুরি। সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজনীতিবিদ, পেশাজীবীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতাও এক্ষেত্রে প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।