জামালগঞ্জে অমৎস্যজীবি কিংবা মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ভুক্ত কিন্তু এখন অন্য পেশায় নিয়োজিত এমন লোকদের নিয়ে মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি গঠন বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেটি সরকারের ভাল ভাল পরিকল্পনার গায়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কলঙ্ক লেপনের শামিল। এরকম অবস্থা শুধু জামালগঞ্জে নয় বরং যেসব জায়গায় ইজারাযোগ্য জলমহাল রয়েছে সর্বত্রই এরকম অবস্থা বিরাজমান। মৎস্যজীবি বাছাই করে মৎস্য অধিদপ্তর আর সমিতির নিবন্ধন প্রদান করে সমবায় অধিদপ্তর। অমৎস্যজীবি কিংবা অপেশাদার মৎস্যজীবিদের নিয়ে সমবায় সমিতি গঠনের দায় এই দুই দপ্তরকেই নিতে হবে। কিন্তু উভয় দপ্তরই দায়সারা গোছের জবাব দিয়ে নিজেদের সাফসুতরো চেহারা প্রমাণে ব্যস্ত। প্রকাশিত সংবাদে মৎস্য কর্মকর্তা বলেছেন, সমিতিতে অমৎস্যজীবি থাকলে তাদের যাচাই-বাছাই করে বাদ দেয়া হবে। অন্যদিকে সমবায় বিভাগের কর্মকর্তা বলেছেন, মৎস্য বিভাগ যাদেরকে মৎস্যজীবি হিসাবে প্রত্যয়ন করছেন তাদেরকে দিয়েই সমিতি করা হচ্ছে। এরকম দায়সারা কথাবার্তায় আসলে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় পার পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এই জবাবদিহিতার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে উঠেছে বলেই জনগণের সেবক হিসাবে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তারা এমন দায়িত্বহীন কথা অবলীলায় বলতে পারেন। মৎস্য বিভাগের প্রতি আমাদের প্রশ্ন, কেন এখন যাচাইর কথা বলা হবে? যখন আপনারা একজন ব্যক্তিকে মৎস্যজীবি হিসাবে প্রত্যয়নপত্র দিচ্ছেন তখন কি তার সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর না নিয়েই সেটি করেছেন? সমবায় অধিদপ্তরকে জিজ্ঞাসা করি, যাদের নিয়ে সমিতি করা হচ্ছে বিশেষ করে বিশেষায়িত সমিতি, সেখানে সদস্যদের পেশা সনাক্তকরণে কি আপনারা একেবারেই দায়মুক্ত থাকতে পারেন?
মৎস্য নীতিমালা অনুসারে ২০ একরের নীচের জলমহালগুলো মৎস্যজীবি সমবায় সমিতিকে ইজারা দেয়া হয়ে থাকে। এটি করা হয়েছিল জাল যার জলা তার নীতিমালার আওতায়। মৎস্যজীবিদের অবস্থার উন্নয়নে সরকার এই ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু যে কেউ একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পারবেন, কোথাও এসব জলমহাল প্রকৃত মৎস্যজীবিরা ইজারা নিতে পারছেন না। হয় নিজেরা তথাকথিত মৎস্যজীবি সেজে অথবা কিছু সুবিধাভোগী অনুগত মৎস্যজীবির নামে ইজারা নিয়ে সাবেক ওয়াটার লর্ডরাই জলমহালের নিয়ন্ত্রণ করছেন। এইসব ওয়াটারলর্ডদের সহায়তা দিচ্ছে মৎস্য অধিদপ্তর ও সমবায় বিভাগ। এটি সরাসরি সরকারের একটি বিঘোষিত নীতির বিরুদ্ধাচরণ। এসব কাজে জড়িতদের শাস্তি দেওয়া উচিৎ। আমরা বরাবরই বলে আসছি, জনগণের কল্যাণে সরকারের বহু ভাল কর্মসূচী ও নীতি রয়েছে। কিন্তু মাঠ প্রশাসন এসব কর্মসূচীকে বানের পানির মতো ভাসিয়ে দেয়। মাঠ প্রশাসন আন্তরিক এবং স্বচ্ছভাবে দায়িত্ব পালন করলে কোন অমৎস্যজীবি সমিতিতে ঢুকতে পারবে না। আবার যেসব ওয়াটারলর্ড অনুগত মৎস্যজীবিদের নিয়ে সমিতি গঠন করে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নেন সেইসব সমিতিও বাতিল করা উচিৎ। এতে করে প্রকৃত মৎস্যজীবিরা সরকারের কল্যাণমুখী কর্মসূচীর সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এই কাজে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণের সবিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তারা সোচ্চার থাকলে সমিতিতে সুবিধাভোগীদের অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা অসম্ভব হবে না।
জামালগঞ্জের যেসব মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির নামে অভিযোগ রয়েছে, আমরা আশা করব সমবায় ও মৎস্য বিভাগীয় উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ তদন্তক্রমে ওই সমিতিগুলোর নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা করবেন দ্রুত গতিতে। শুধু জামালগঞ্জ নয় বরং সর্বত্রই এই কাজটি করা দরকার। নতুন সমিতি গঠনের সময় যাতে একজন অমৎস্যজীবিও সদস্য না হতে পারেন সে বিষয়ে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে। আর সুবিধাভোগী পকেট সমিতির মৎস্যজীবি যারা ওয়াটারলর্ডদের স্বার্থ সংরক্ষণে নিয়োজিত তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মৎস্যজীবিদের সোচ্চার হতে হবে।

