সর্বনাশা বিদেশ-নেশা

অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার আশায় পাগলপারা যুবকদের হেনস্তা ও হয়রানির পরিমাণ কমছে তো না-ই, ক্রমাগত বেড়ে চলেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে অনুমান করা যায়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের ভিকারগাঁও গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী তিন তরুণ ইতালি যাওয়ার জন্য দালাল ধরলে তারা প্রতারণা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। কথিত মাফিয়াচক্রের নামে লিবিয়ায় থাকা জনৈক বাঙালি ও দেশে থাকা তার পরিবারের মাধ্যমে এখন মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। এই তিন তরুণকে লিবিয়ায় আটক করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করা হচ্ছে এবং লাঞ্ছনার ছবি প্রতারিত তরুণদের পরিবারবর্গের কাছে পাঠিয়ে ও আটককৃত তরুণদের সাথে কথা বলিয়ে দাবিমত টাকা দেয়ার জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে। প্রকাশিত সংবাদ ভাষ্য থেকে জানা যায়, উপজেলার ভিখারগাঁও গ্রামের সুমন মিয়া, কুশিউরা গ্রামের নোমান মিয়া ও চনোগাঁও গ্রামের সৌরভ আহমদ গত বছরে অক্টোবর মাসে লিবিয়া যান। লিবিয়ায় আগে থেকে অবস্থানরত একই উপজেলার বরখাল গ্রামের আব্দুল বারেক এই তিন তরুণের লিবিয়া আসার খবর জানতে পারে। সে তাদের লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে এবং জনপ্রতি সাড়ে সাত লাখ টাকা করে দাবি করে। দেশে থাকা আব্দুল বারেকের স্ত্রী, পুত্র ও শ্যালকের সাথে ওই তিন তরুণের অভিভাবকরা চুক্তি করেন এবং টাকা দেন। চুক্তি মোতাবেক টাকা দেয়ার কিছুদিন পর দালাল আব্দুল বারেকের পরিবার থেকে জানানো হয় ওই তিন তরুণ লিবিয়ায় মাফিয়াচক্রের হাতে আটক হয়েছে। মাফিয়ার হাত থেকে ছাড়াতে জনপ্রতি তিন লাখ টাকা দিতে হবে। তরুণদের অভিভাবকরা সেই টাকাও দেন। এরপর দুইমাস কেটে গেছে। কয়েকদিন আগে প্রতারিত তরুণদের সাথে মোবাইল ফোন কথা বলিয়ে তাদের চিৎকার ও আহাজারি শোনানো হয়। তরুণদের মারপিট করার ছবি সামাজিক যেগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেয়া হয়। অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, প্রতারক ও দালাল আব্দুল বারেকের স্ত্রী এখন আরও টাকা দাবি করে বলেছেন এই টাকা পেলে তাদের ইতালি পাঠানো যাবে, চাইলে তারা দেশেও ফিরে আসতে পারবে।
অভিযোগটি গুরুতর নিঃসন্দেহে। বিশেষ করে অপরাধটি বিদেশে সংঘটিত হওয়ায় এর প্রতিকার প্রক্রিয়াও বেশ জটিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য মতে প্রতারিত তিন তরুণ এখনও কথিত মাফিয়াচক্রের হাতে আটক আছেন। তাই বিষয়টি স্পর্শকাতরও বটে। দোয়ারাবাজার থানার ওসি জানিয়েছেন, তিনি প্রতারিত যুবকদের পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় দেখবেন। তবে বিষয়টি যে খুবই স্পর্শকাতর ও জটিল তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এ ধরনের প্রতারণা কিংবা ইউরোপের কোনো দেশে মানবেতরভাবে যাওয়ার পথে করুণ মৃত্যুর খবর মাঝেমধ্যেই আমরা পেয়ে থাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এত সব ঘটনার পরও কেউ সাবধান হচ্ছেন না। আগুনে পতঙ্গের ঝাঁপ দেয়ার মতো বিদেশ যাওয়ার নেশায় এই ধরনের বিপজ্জনক পথকেই অনেকে বেছে নেন।
অতিমাত্রার ঝুঁকি ও বিপদ জেনেও দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে আমাদের যুবক তরুণরা দলে দলে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে। কেউ যাচ্ছে বৈধ উপায়ে। বেশির ভাগ অবৈধ উপায়ে। অবৈধভাবে যারা যায় তারা ঝুঁকি জেনেই যায়। মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন; এই যেন বেপরোয়া যুব সমাজের সংকল্প। এই সর্বনাশা পথ থেকে বেরিয়ে আসা উচিৎ। দোয়ারাবাজারের তিন তরুণের বিষয়ে তাদের স্বজনরা যে ভয়াবহ অভিযোগ এনেছেন তার আদ্যান্ত খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং সবার আগে আটক তরুণদের উদ্ধার করা জরুরি। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা লিবিয়াস্ত বাংলাদেশ দুতাবাস ও লিবিয়া সরকারের সহায়তা নিতে পারে। প্রতারক হিসাবে অভিযুক্ত আব্দুল বারেকের পক্ষে দেশিয় এজেন্ট হিসাবে কাজ করা আত্মীয়দের আইনের আওতায় আনা হলে বিষয়টি সহজ হবে বলে আমরা মনে করি।