নেদারল্যান্ডস’র হ্যাগ সিটিতে আটটি দেশের যৌথ উদ্যোগে পালিত হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

মতিয়ার চৌধুরী, লন্ডন
প্রথম বারের মতো নেদারল্যান্ডের হ্যাগে আটটি দেশের যৌথ উদ্যোগে একত্রে পালিত হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং ভিয়েতনাম দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে যথাযথ ভাবগম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। নেদারল্যান্ডস এ এবারই প্রথম বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগের সাথে একাত্ম হয়ে আরও সাতটি দেশের দূতাবাস যৌথভাবে এই আন্তর্জাতিক দিবসটি পালন করা হয়েছে। দ্য হেগ নগরীর সাউদার্ন পার্ক প্যাভিলিয়ন চত্বরে আয়োজিত ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে প্রত্যেকটি দূতাবাসের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষ্যণীয়।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কর্মসূচি শুরু হয় প্যাভিলিয়ন চত্বরে অস্থায়ীভাবে নির্মিত শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে। দূতাবাসসমূহ, হল্যান্ড আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন হল্যান্ড এবং সীমানা পেরিয়ে ও বাংলা ইউনাইটেড সহ অভিবাসী ও উন্নয়ন সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুরে সুরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। প্রদর্শন করা হয় বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র ‘আমার ভাষা, আমার অহংকার’। মঞ্চস্থ করা হয় বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশসমূহের পতাকা হাতে দাঁড়ানো শিশুদের নিজস্ব ভাষায় ‘আমার ভাষা, আমার অহংকার’ শীর্ষক দৃপ্ত ঘোষণা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত করতে আন্দোলন ও সংগ্রামের নানা দিক নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা পর্বে অংশ নেন হেগ নগরীর ডেপুটি মেয়র মি. রবিন বালদেউসিং, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মি. ইত্তিপর্ন বুনপ্রাকং, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মি, জে এস মুকুল, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত মি. এ এম সাদিক, ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসের মিনিস্টার মি. ইবনু ওয়াহিউতম, মালয়েশিয়ার দূতাবাসের কাউন্সেলর মি. আহমাদ জুওয়াইরি ইউসুফ, ভিয়েতনামি দূতাবাসের প্রথম সচিব মিজ ফাম হং হান, হল্যান্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব মায়িদ ফারুক এবং আন্তর্জাতিক নেপালি শিল্পী পরিষদের প্রতিনিধি মি. পুষ্পা বারুয়াল। সভায় সভাপতিত্ব করেন নেদারল্যান্ডস এ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জনাব শেখ মোহাম্মদ বেলাল। রাষ্ট্রদূতের সহধর্মিনী মিজ ড. দিলরুবা নাসরিন উপস্থিত সম্মানিত অতিথি, সুধী মন্ডলী, কলাকুশলী, সংগঠক এবং স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ জানান এবং সম্মানিত অতিথিবৃন্দ এবং বাংলাদেশী ও অন্যান্য দেশীয় কলা-কুশলীদের হাতে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন।  
রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল বাংলাদেশ মিশনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এবছর যৌথভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পালনের জন্য নেদারল্যান্ডস এ অবস্থিত অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বাংলা ভাষার সাথে ভারত ও নেপালসহ এশিয়ার শ্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার ঐতিহাসিক যোগসূত্র ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন এবং এ অঞ্চলের ভাষাগুলোর বন্ধন ও গৌরবগাঁথা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা উপস্থাপন করেন। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন জাতিসত্বার নিজস্ব ভাষার জন্য আন্দলন-সংগ্রামের উপর আলোকপাত করেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি একদিকে শোকের দিন এবং অন্যদিকে অত্যন্ত বড় মাপের অর্জনের এবং গৌরবের দিন। আপনারাই গর্বিত বাংলাদেশী অভিবাসী যারা আন্তর্জাতিক দরবারে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার দাবি তুলেছিলেন। এই ঐতিহাসিক দিনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষকেও নিজেদের মাতৃভাষাকে সমুন্নত করতে এবং সম্মানজনক অবস্থানে রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। মাতৃভাষা শুধুমাত্র একটি ভাষাই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ধারা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বাহন।
আলোচনা পর্বে বেলাল ১৯৭১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের কিছু অংশ পড়ে শোনান। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, বাংলার মানুষ রক্ত দিয়েছে। তারা ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য যে রক্ত দেওয়া শুরু করেছে সে রক্ত আজও থামেনি। কবে শেষ হবে তাও জানি না। আজ শহীদ দিবসে শপথ নিতে হবে যে পর্যন্ত বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার অধিকার আদায় করতে না পারবে সেই পর্যন্ত বাংলার মা-বোনেরা, বাংলার ভাইয়েরা শহীদ এবং গাজী হতে থাকবে। যে ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৫২ সালে গুলি করে আমার ভাইদের শহীদ করেছিল, আজও তাদের ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। ষড়যন্ত্র আজও চলছে, ভবিষ্যতে চলবে। কিন্তু তারা জানেনা যে, শেষ বিজয় আমাদেরই হবে। যারা আজ বাংলার সংস্কৃতিকে, বাংলার মানুষকে লুট করতে চায়, কলোনি বানাতে চায়, বাজার বানাতে চায়, যারা এতো বড় বিজয়ের পরও ষড়যন্ত্র করতে চায়, তাদের জেনে রাখা উচিত, ১৯৫২ সালের বাঙালি এবং ১৯৭১ সালের বাঙালির মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই আমি আপনাদের কাছে আবেদন করতে চাই, বাংলার প্রতিটি ঘরে প্রস্তুত হউন। বাংলার ভাইয়েরা, এবার শহীদ নয়, গাজী হয়ে মার কোলে ফিরে যেতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যৎ বংশধর বুক উঁচু করে বলতে পারবে আমি বাঙালি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, সেদিন ছিল ১৯৭১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। আর আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই প্রত্যাশা ও দক্ষ নেতৃত্বের প্রতিফলন হিসেবেই গর্বের সাথে বলতে পারি আমি বাঙালি। আজ এই দিনে তাই আমি আপনাদের সকলের প্রতি আহ্বান জানাই যেখানে বাংলা, বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, আসুন সেখানে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, আমাদের গৌরবময় মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে এবং আরও সমুন্নত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিবৃন্দ নিজেদের দেশের জাতিস্বত্বার এবং মাতৃভাষার ধারা ও ঐতিহ্য এবং ভাষার জন্য আন্দোলন ও সংগ্রামের উপর আলোকপাত করেন। তাঁরা এশীয় ভাষাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র এবং বাংলা ও বাঙালিদের ভাষা আন্দোলনের সাথে নিজেদের ভাষা ও ভাষা আন্দোলনগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন।
দ্য হেগ নগরীর ডেপুটি মেয়র মি. বালদেউসিং হেগ নগরীকে শাস্তি, ন্যায় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের নগরী বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বাঙালিদের মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং হেগ নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থায়ীভাবে শহীদ মিনার স্থাপনের গুরুত্বের কথা স্বীকার করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি কূটনীতিক এবং প্রবাসী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, হেগ নগরীতে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের বিষয়টি এককভাবে শুধুমাত্র নগরীর কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভর করে না, বরং এক্ষেত্রে কূটনৈতিক মিশন, প্রবাসীদের সংগঠন, প্রবাসী গোষ্ঠী, বুদ্ধিজীবী এবং পেশাজীবীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে হেগ নগরীতে স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে  নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিজের স্বক্রিয় ভূমিকার ব্যাপারে তিনি আশ্বাস দেন।
আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জনপ্রিয় শিল্পী ও উপস্থাপক মি. চিত্তব্রত সাহা এবং মিজ ফারিয়া শারমিন রিমি। সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিজ ইলমা জারিফা আহমেদ, মিজ অবন্তিকা সাহা স্নেহা, মিজ জুনাইরা ওয়ারিসা লিটন, মিজ ফারিন জুনাইনা প্রিমা, মিজ চারু সাহা, মিজ সুস্মিতা, মিজ শ্রুতি এবং মিজ তানিশা তালুকদার মেঘলা, ভারতের পক্ষ থেকে মিজ প্রজনা ভট্টাচার্য, ইন্দোনেশিয়া থেকে মি. বিমা আগুন পুত্রা এবং মিজ ফিকরিয়া কারিনানুর, নেপালের পক্ষ থেকে মিজ কাস্তুরি কো বিনা, মি. যাদু যুগান্তর রায়, মি. মিত্র রায়, মি. মোহন রায়, মি. পুষ্পা বারুয়াল, মি. অর্পণ পোখারেল, মি. চজাং খোয়াব, মি. রিয়াজ সুবেদি, মি. বিবেক গৌতম এবং মিজ সারিতা হুমাগাই, মালয়েশীয় জনপ্রিয় তারকা শিল্পী মিজ শাফাতুসসারা সিলাহুদিন শাফা, শ্রীলংকা থেকে মিজ লংকা হেওয়া কান্দাম্বি এবং মিজ থুরি বালাকৃষ্ণন, থাইল্যান্ডের আখিরা নৃত্য গোষ্ঠী এবং ভিয়েতনামের মিজ ত্রাং ফাম সংগীত, কবিতা, নৃত্য এবং যন্ত্র সংগীত পরিবেশন করেন।