মৃত মানুষের সৎকারের স্থান নিয়ে এত বাহানা কেন?

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মরদেহ সৎকারের প্রধান শ্মশানঘাটটি ধূপাখালি সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত। এই শ্মশানঘাটটিতে শত বছরের অধিক কাল যাবৎ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা মরদেহ দাহ করে আসছেন। একসময় সুরমার ভাঙনের কবলে পড়েছিল শ্মশানঘাটটি। ভাঙন কবলিত হয়ে শ্মশানের বহু জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পরবর্তীতে নদীর ভাঙন বন্ধ হয়েছে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে। এদিকে পৌর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় নির্বিঘœ দাহ সম্পন্ন করার জন্য নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে বৃহদাকারের চুল্লিঘর। চারপাশে নির্মাণ করা হয়েছে বসার জন্য পাকা ব্যাঞ্চি। শ্মশানঘাটটি এখন এক ধরনের পবিত্রতা ধারণ করে মানুষের শেষ ঠিকানার উপযুক্ত হয়েছে। এজন্য শ্মশানঘাট পরিচালনা কমিটি (যখন যারা দায়িত্বে ছিলেন) নিরলস ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ হিন্দু সম্প্রদায়ের এই প্রধান শ্মশানঘাটটির উপর কিছু ভূমিখেকোর লুলোপ দৃষ্টি পড়েছে। এরা ভুয়া দলিল সৃজনের মাধ্যমে শ্মশানঘাটের জায়গা দখল করে নেয়ার পাঁয়তারা করে। কিছু দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারীর সহায়তায় নিজেদের নামে নামজারি করিয়ে নিতেও সক্ষম হয় ওই জালিয়াতচক্র। যা পরবর্তীতে বাতিল হয়। এই অপদখলের বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়রের নজরে আসলে তাাঁরা দখল প্রতিহত করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এখন আবার ওই দখলবাজচক্র অন্যভাবে শ্মশানযাত্রীদের বাধা সৃষ্টি করছেন বলে জানা গেছে। গতকাল এ বিষয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। সকলেরই জানা আছে যে, মৃতদেহ সৎকারের সময় বিশেষ কিছু ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে লাশে মুখাগ্নির সময় মুখাগ্নীকারীগণকে ¯œান করা। সৎকারের পর মৃতদেহের নাভিমূল (যা দগ্ধ হয় না) নদীতে পুঁতে রাখতে হয়। তখনও আবার ¯œান করতে হয়। সৎকারের পর চুলা ও আশপাশ ভালভাবে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিতে হয়। তাছাড়া শ্মশানযাত্রীদেরও দাহশেষে ¯œান করার আবশ্যিকতা রয়েছে। এজন্য শ্মশানতীরবর্তী সুরমা নদীর উপর নির্ভর করতেন শ্মশানযাত্রীগণ। সম্প্রতি শ্মশানঘাট থেকে নদীতে নামার পথে পূর্বোক্ত দখলকারী অবৈধভাবে বালু ও বাঁশ রেখে শ্মশানযাত্রীদের নদীতে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা শুরু করেছেন। এ নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক জনের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। গত শুক্রবার শহরের বিশিষ্ট রাজনীতিক ও আইনজীবী সুরেশ দাসের দাহ কাজে অংশগ্রহণের সময় শহরের বহু বিশিষ্ট জন এই অবস্থা দেখে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। জানা যায়, শ্মশান পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে বালু ও বাঁশ রেখে যারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন তাদেরকে রাস্তাটি পরিষ্কার করে দেয়ার জন্য বহুবার অনুরোধ করা হলেও তিনি বা তারা এতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করছেন না। বরং তারা এ বিষয়ে উদ্ধত মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন।
সকল মানুষ ও জীবকেই একসময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীতে ধ্রুবসত্য হিসেবে যে কয়টি বিষয় রয়েছে মৃত্যু তন্মধ্যে অন্যতম। ধার্মিক মানুষ মাত্রই সর্বদা মৃত্যুচিন্তায় মগ্ন থাকেন। মৃতদেহ যারা সৎকার করতে আসেন তারা সকলেই স্বজন হারানোর বেদনায় ব্যথাতুর থাকেন। হৃদয়ে গভীর বেদনাবোধ নিয়ে শ্মশানযাত্রীরা যখন শ্মশানঘাটে এসে অন্য আরেক বিরূপ পরিস্থিতি ও প্রতিবন্ধকতার সন্মুখীন হন তখন তাদের মনের অবস্থা কেমন হয় তা মানবিক মানুষ মাত্রই বুঝতে সক্ষম। আমরা অবাক হয়ে যাই ধূপাখালি শ্মশানঘাটের জায়গা অপদখল প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিবর্গ এত অমানবিক হলেন কীভাবে? তাদের ভিতরে কি বিন্দুমাত্র মৃত্যুচিন্তা কাজ করে না? আমরা অবৈধ দখলবাজদের হৃদয়ে সুচিন্তার জাগৃতি কামনা করি। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও আশা করি।